হোমএআই নিউজশিক্ষার্থীর হয়ে পুরো অনলাইন কোর্স করছে এআই এজেন্ট, শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন চ্যালেঞ্জ
ক্যাটেগরি:

শিক্ষার্থীর হয়ে পুরো অনলাইন কোর্স করছে এআই এজেন্ট, শিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন চ্যালেঞ্জ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অ্যাসাইনমেন্ট লেখা এখন আর নতুন বিষয় নয়। কিন্তু পরিস্থিতি আরও এক ধাপ এগিয়েছে। নতুন এআই এজেন্ট নিজেরাই অনলাইন কোর্সে প্রবেশ করে পাঠ দেখা, কুইজ দেওয়া এবং লেখা জমা দেওয়ার মতো কাজ করতে পারছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীর হয়ে অনলাইন কোর্সের একাধিক কাজ সম্পন্ন করতে স্বয়ংক্রিয় এআই ব্যবহারের ঘটনা নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষ করে শিক্ষক সরাসরি উপস্থিত না থাকা অনলাইন কোর্সে এটি শনাক্ত করা আরও কঠিন হতে পারে।

এআই এজেন্ট ব্যবহারের সঙ্গে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও জড়িত। TechnicalBD এর Microsoft Zero Trust ও এআই এজেন্ট নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিবেদন দেখায়, স্বয়ংক্রিয় এআইকে বিভিন্ন সেবা ও তথ্য ব্যবহারের অনুমতি দিলে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

TechnicalBD এর এই হালনাগাদ প্রতিবেদনে এআই এজেন্ট কীভাবে অনলাইন কোর্সে কাজ করছে, প্রচলিত মূল্যায়ন ব্যবস্থা কেন চাপে পড়ছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে তা সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো।

সাধারণ চ্যাটবট থেকে এআই এজেন্টের পার্থক্য

সাধারণ চ্যাটবট ব্যবহার করলে শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন কপি করা, নির্দেশ দেওয়া এবং তৈরি করা উত্তর নিজে জমা দিতে হয়। অর্থাৎ কাজের বিভিন্ন ধাপে মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ এখনো প্রয়োজন হয়।

এআই এজেন্ট তুলনামূলকভাবে বেশি স্বয়ংক্রিয়। প্রয়োজনীয় অনুমতি পেলে এটি ওয়েবপেজ পড়া, বিভিন্ন বোতামে ক্লিক করা, নির্ধারিত ধাপ অনুসরণ করা এবং একটি কাজ শেষ করার জন্য পরপর একাধিক পদক্ষেপ নিতে পারে।

এ ধরনের স্বয়ংক্রিয় কাজ বাস্তবে কত দূর যেতে পারে, তার আরেকটি উদাহরণ TechnicalBD এর এআই দিয়ে ব্যবসায়িক কাজ স্বয়ংক্রিয় করার প্রতিবেদন। সেখানে মানুষের পুনরাবৃত্ত কাজের একটি অংশ এআই ব্যবস্থার মাধ্যমে সহজ করার বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায়।

তবে শিক্ষা ক্ষেত্রে একই ক্ষমতা ব্যবহার করে শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন সম্পন্ন করা হলে সেটি শেখার সহায়তার বদলে একাডেমিক সততার সমস্যা তৈরি করতে পারে।

এআই এজেন্ট অনলাইন কোর্সে কী করতে পারে

প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন এআই এজেন্টের কথা উঠে এসেছে, যেগুলো অনলাইন পাঠ দেখা, বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, লেখা তৈরি এবং কোর্সের আলোচনায় অংশ নেওয়ার মতো একাধিক কাজ সম্পন্ন করতে পারে।

সব শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম বা সব এআই এজেন্ট একইভাবে কাজ করবে না। কোনো ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার সীমিত থাকতে পারে, আবার কোথাও মানুষের অনুমোদন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করা সম্ভব নাও হতে পারে।

তবু প্রযুক্তির বর্তমান ক্ষমতা বোঝার জন্য TechnicalBD এর Google AI Agent পরীক্ষায় নিয়ম এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রাসঙ্গিক। পরীক্ষায় দেখা গেছে, লক্ষ্য পূরণের চাপে কোনো কোনো এজেন্ট প্রত্যাশিত নিয়মের বাইরে আচরণ করার চেষ্টা করতে পারে।

এ কারণেই শুধু একটি এআইকে কাজের লক্ষ্য বলে দেওয়া যথেষ্ট নয়। কোন কাজ করতে পারবে, কোন তথ্য দেখতে পারবে এবং কোন পর্যায়ে মানুষের অনুমতি লাগবে, সেই সীমাও গুরুত্বপূর্ণ।

অনলাইন শিক্ষায় সমস্যা বেশি কেন

সশরীরে পরীক্ষায় শিক্ষক সাধারণত শিক্ষার্থীর পরিচয় এবং পরীক্ষা দেওয়ার পরিবেশ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। কিন্তু অনেক অনলাইন কোর্সে শিক্ষার্থী নিজের সুবিধামতো সময়ে একা বসে পাঠ ও মূল্যায়নের কাজ সম্পন্ন করেন।

এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় আগে থেকে ধারণ করা ভিডিও, অনলাইন কুইজ, আলোচনা এবং লিখিত অ্যাসাইনমেন্টের ওপর বেশি নির্ভরতা থাকতে পারে। ফলে কাজটি শিক্ষার্থী নিজে করেছেন নাকি সফটওয়্যার করেছে, তা সবসময় সহজে বোঝা যায় না।

এআই এজেন্ট যদি ওয়েব ব্রাউজার ব্যবহার করে একাধিক ধাপ নিজেই সম্পন্ন করতে পারে, তাহলে শুধু চূড়ান্ত উত্তর বা জমা দেওয়া লেখা পরীক্ষা করে সত্যিকারের অংশগ্রহণ বোঝা আরও কঠিন হয়ে যায়।

শুধু এআই লেখা শনাক্ত করলেই সমাধান হবে না

প্রথম দিকে শিক্ষাক্ষেত্রে উদ্বেগের বড় অংশ ছিল ChatGPT বা অন্য এআই দিয়ে লেখা অ্যাসাইনমেন্ট শনাক্ত করা। কিন্তু এআই এজেন্ট শুধু লেখা তৈরি না করে পুরো কাজের প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে গেলে সমস্যার ধরন বদলে যায়।

তার ওপর এআই লেখা শনাক্তকারী সফটওয়্যার শতভাগ নির্ভুল নয়। মানুষের লেখা ভুলভাবে এআই তৈরি বলে শনাক্ত হওয়ার ঘটনাও গবেষক ও শিক্ষকদের উদ্বেগের কারণ হয়েছে।

তাই শুধু একটি শনাক্তকারী সফটওয়্যারের ফল দেখে কোনো শিক্ষার্থী অসদুপায় ব্যবহার করেছেন বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। কাজের ইতিহাস, মৌখিক ব্যাখ্যা এবং শেখার অন্যান্য প্রমাণও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এআই এজেন্টের ক্ষমতা আরও বাড়ছে

এআই এজেন্ট এখন শুধু লেখা তৈরি বা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নতুন ব্যবস্থাগুলো ফাইল ব্যবহার, সফটওয়্যার চালানো এবং একাধিক ধাপের কাজ নিজেরাই সম্পন্ন করার দিকে এগোচ্ছে।

TechnicalBD এর ASUS ProArt কম্পিউটারে লোকাল এআই এজেন্ট নিয়ে প্রতিবেদন দেখায়, শক্তিশালী কম্পিউটারে এআই এজেন্ট সরাসরি নিজের ডিভাইসে চালানোর দিকেও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এগোচ্ছে।

এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যক্তিগত উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে একই ক্ষমতা শিক্ষা মূল্যায়নের মতো জায়গায় ব্যবহার করা হলে প্রতিষ্ঠানকে নতুন ধরনের পরিচয় যাচাই এবং কাজের সত্যতা নিশ্চিত করার পদ্ধতি তৈরি করতে হবে।

শিক্ষকেরা মূল্যায়নের ধরন বদলাচ্ছেন

অনেক শিক্ষক এখন শুধু বাসায় বসে সম্পন্ন করা লিখিত কাজের ওপর নির্ভরতা কমানোর কথা ভাবছেন। এর পরিবর্তে মৌখিক পরীক্ষা, সশরীরে পরীক্ষা, সরাসরি উপস্থাপনা এবং ধাপে ধাপে প্রকল্প তৈরির মতো পদ্ধতির গুরুত্ব বাড়ছে।

এই পদ্ধতিতে শুধু চূড়ান্ত উত্তর নয়, শিক্ষার্থী কীভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন সেটিও দেখা যায়। ফলে অন্য কোনো ব্যক্তি বা এআই পুরো কাজটি করে দিলে তা শনাক্ত করা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে।

ক্লাসের নির্দিষ্ট আলোচনা, নিজের অভিজ্ঞতার উদাহরণ এবং শিক্ষকের সামনে কাজ ব্যাখ্যা করার মতো মূল্যায়নও শিক্ষার্থীর প্রকৃত জ্ঞান যাচাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এআই কি শিক্ষায় শুধু সমস্যা তৈরি করছে

না। শিক্ষার্থীর হয়ে পুরো মূল্যায়ন সম্পন্ন করা এবং শিক্ষার্থীকে কোনো বিষয় বুঝতে সাহায্য করা এক বিষয় নয়।

সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এআই ব্যক্তিগত শিক্ষকের মতো ধারণা ব্যাখ্যা করতে, কঠিন বিষয় সহজ করতে, অনুশীলনের প্রশ্ন তৈরি করতে এবং শিক্ষার্থীর ভুল কোথায় হচ্ছে তা বুঝতে সাহায্য করতে পারে।

মূল প্রশ্ন হলো শিক্ষার্থী এআই ব্যবহার করে শিখছেন, নাকি নিজের শেখার দায়িত্ব পুরোপুরি এআইকে দিয়ে দিচ্ছেন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি এই পার্থক্য স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে পারে, তাহলে এআই পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে দায়িত্বশীল ব্যবহারের নিয়ম তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশেও বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্মে ডিজিটাল অ্যাসাইনমেন্ট ও অনলাইন মূল্যায়নের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে এআই ব্যবহারের স্পষ্ট নিয়ম তৈরি করা এখন থেকেই প্রয়োজন।

কোন কাজে এআই ব্যবহার করা যাবে, কোথায় শিক্ষার্থীকে নিজের কাজ দেখাতে হবে এবং কোন ধরনের ব্যবহার অসদুপায় হিসেবে বিবেচিত হবে, তা শিক্ষার্থীদের আগেই জানানো উচিত।

শুধু সফটওয়্যার দিয়ে অসদুপায় ধরার চেষ্টা না করে মূল্যায়ন এমনভাবে সাজানো দরকার, যাতে শিক্ষার্থীর ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং বাস্তব দক্ষতা যাচাই করা যায়।

সাধারণ প্রশ্ন

এআই এজেন্ট কি সত্যিই পুরো অনলাইন কোর্স করতে পারে

কিছু পরীক্ষায় এবং প্রতিবেদনে এআই এজেন্টকে অনলাইন পাঠ দেখা, কুইজ দেওয়া, লেখা তৈরি এবং আলোচনায় অংশ নেওয়ার মতো একাধিক কাজ করতে দেখা গেছে। তবে সব প্ল্যাটফর্মে একই ক্ষমতা থাকবে এমন নয়।

এআই শনাক্তকারী সফটওয়্যার কি অসদুপায় নিশ্চিতভাবে ধরতে পারে

না। এ ধরনের সফটওয়্যারে ভুল ফল আসতে পারে। তাই শুধু শনাক্তকারী ব্যবস্থার ফলের ওপর নির্ভর না করে শিক্ষার্থীর কাজের প্রক্রিয়া এবং মৌখিক ব্যাখ্যাও দেখা গুরুত্বপূর্ণ।

পড়াশোনায় এআই ব্যবহার করাই কি অসদুপায়

সবসময় নয়। কোনো বিষয় বুঝতে, অনুশীলন করতে বা নিজের লেখা উন্নত করতে প্রতিষ্ঠানের নিয়ম অনুযায়ী এআই ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু শিক্ষার্থীর বদলে পরীক্ষা বা মূল্যায়নের পুরো কাজ এআইকে দিয়ে করানো একাডেমিক সততার সমস্যা তৈরি করে।

শেষ কথা

এআই এজেন্টের দ্রুত উন্নতি অনলাইন শিক্ষার প্রচলিত মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে নতুন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। শুধু জমা দেওয়া লেখা দেখে একজন শিক্ষার্থী সত্যিই বিষয়টি শিখেছেন কি না, সেটি বোঝা ক্রমেই কঠিন হচ্ছে।

সমাধান শুধু নতুন শনাক্তকারী সফটওয়্যার তৈরি করা নয়। বরং এমন মূল্যায়ন পদ্ধতি দরকার, যেখানে শিক্ষার্থীকে নিজের জ্ঞান, সিদ্ধান্ত এবং কাজের প্রক্রিয়া সরাসরি দেখাতে হয়।

এআই শেখার শক্তিশালী সহকারী হতে পারে। কিন্তু একই প্রযুক্তি যখন শিক্ষার্থীর হয়ে পুরো কোর্স সম্পন্ন করে, তখন শিক্ষা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

রাসেল আকন্দ
রাসেল আকন্দhttps://technicalbd.com
রাসেল আকন্দ TechnicalBD-এর লেখক ও সম্পাদক। তিনি স্মার্টফোন, কম্পিউটার, গ্যাজেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং দৈনন্দিন প্রযুক্তি নিয়ে সহজ ও তথ্যভিত্তিক বাংলায় লেখেন। নতুন প্রযুক্তির খবর যাচাই করে বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য ব্যবহারযোগ্যভাবে উপস্থাপন করাই তাঁর লেখার মূল লক্ষ্য।
সম্পর্কিত পোস্ট

জনপ্রিয় পোস্ট