সিনেমার পর্দায় বিশাল কোনো শহর ধ্বংস হচ্ছে, কাল্পনিক প্রাণীর মুখে ফুটে উঠছে মানুষের মতো অনুভূতি, কিংবা এমন একটি পৃথিবী দেখা যাচ্ছে যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই। আমরা কয়েক ঘণ্টায় এসব দৃশ্য দেখে ফেললেও, পর্দার পেছনে একটি দৃশ্য তৈরি করতেই শিল্পী ও প্রযুক্তিবিদদের প্রচুর সময় এবং কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন হয়।
এবার সেই কাজের ধরনেই বড় পরিবর্তন আনতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। AMD-এর অফিসিয়াল আলোচনায় কোম্পানিটির প্রযুক্তি প্রধান Mark Papermaster এবং বিখ্যাত ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট প্রতিষ্ঠান Wētā FX-এর প্রযুক্তি প্রধান Kimball Thurston জানিয়েছেন, AI, rendering ও simulation কীভাবে ভবিষ্যতের সিনেমা এবং গল্প বলার পদ্ধতিকে বদলে দিতে পারে।
AI আসছে শিল্পীর জায়গা নিতে নয়, কাজ সহজ করতে
AI নিয়ে আলোচনা উঠলেই একটি প্রশ্ন সামনে আসে, প্রযুক্তি কি শেষ পর্যন্ত শিল্পীর কাজটাই নিয়ে নেবে?
AMD ও Wētā FX-এর আলোচনায় বরং অন্য একটি ছবিই দেখা যায়। Wētā FX ইতিমধ্যে AI ব্যবহার করছে শিল্পীদের প্রয়োজনীয় ডিজিটাল উপকরণ খুঁজে পেতে, কিছু উৎপাদন কাজ স্বয়ংক্রিয় করতে এবং জটিল দৃশ্যের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো তৈরি ও অনুকরণে সহায়তা করার জন্য।
ধরুন, একটি বড় সিনেমার জন্য বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য ডিজিটাল চরিত্র, পরিবেশ, বস্তু ও অন্যান্য উপকরণ তৈরি হয়েছে। প্রয়োজনের সময় সেই বিশাল সংগ্রহ থেকে ঠিক জিনিসটি খুঁজে বের করাও কঠিন। AI সেই কাজ দ্রুত করতে পারলে শিল্পী তার সময়টা আসল সৃজনশীল কাজে দিতে পারবেন।
AI এখন শুধু ছবি বা লেখা তৈরিতেই সীমাবদ্ধ নেই। TechnicalBD-তে আমাদের Claude কীভাবে নিজেই কম্পিউটার ব্যবহার করে বিভিন্ন কাজ করতে পারে সেই লেখাতেও দেখা গেছে, AI ধীরে ধীরে বাস্তব কাজের সহকারী হয়ে উঠছে।
একটি সিনেমার পেছনে কতটা কম্পিউটিং শক্তি লাগে?
আজকের বড় সিনেমা ও সিরিজে এমন সব ডিজিটাল জগৎ তৈরি হচ্ছে, যেগুলো বাস্তবের মতো দেখাতে বিপুল হিসাব করতে হয়। আলো কোথা থেকে আসছে, চুল বা কাপড় কীভাবে নড়ছে, পানি, ধোঁয়া কিংবা হাজারো ছোট উপাদান কীভাবে আচরণ করবে, সবকিছুর পেছনেই রয়েছে জটিল গণনা।
মজার বিষয় হলো, সব ভারী কাজ শুধু GPU দিয়ে হয় না। AMD-এর আলোচনায় উঠে এসেছে, সবচেয়ে জটিল কিছু rendering-এর কাজ এখনো CPU-এর ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ভবিষ্যতের কাজেও তাই একটি মাত্র চিপের ওপর নির্ভর না করে CPU, GPU, স্থানীয় AI এবং cloud মিলিয়ে কাজ করার প্রবণতা বাড়বে।
| বিষয় | ভবিষ্যতের কাজে ভূমিকা |
|---|---|
| CPU | জটিল rendering ও সাধারণ হিসাব |
| GPU | দ্রুত গ্রাফিক্স ও সমান্তরাল হিসাব |
| AI | উপকরণ খোঁজা, কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয় করা ও simulation-এ সহায়তা |
| Local AI | কাছের যন্ত্রেই কিছু AI কাজ করা |
| Cloud | প্রয়োজনমতো বড় আকারের কম্পিউটিং শক্তি ব্যবহার |
নিজের কম্পিউটারেই বড় AI চালানোর প্রবণতাও ইতিমধ্যে বাড়ছে। চাইলে TechnicalBD-এর Local AI ও নতুন ProArt কম্পিউটার নিয়ে আমাদের লেখাটি পড়ে এই পরিবর্তন সম্পর্কে আরও ধারণা নিতে পারেন।
Avatar থেকে Superman, প্রযুক্তির পেছনে Wētā FX
Wētā FX নামটি সিনেমাপ্রেমীদের কাছে নতুন নয়। AMD জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির দল Avatar: Fire and Ash, Superman এবং Stranger Things-এর মতো বড় নির্মাণের কাল্পনিক জগৎকে পর্দায় জীবন্ত করে তুলতে কাজ করেছে।
এ কারণেই তাদের AI ব্যবহার নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। এখানে শুধু ভবিষ্যতে কী হতে পারে সেই অনুমান করা হচ্ছে না, বরং বড় আকারের ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট তৈরির বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে প্রযুক্তির পরবর্তী ধাপ নিয়ে কথা বলা হচ্ছে।
তবে AI যত শক্তিশালীই হোক, ভালো সিনেমার মূল জায়গাটি এখনো গল্প। AMD-এর প্রকাশনাতেও এমন ভবিষ্যতের কথা বলা হয়েছে যেখানে প্রযুক্তি শিল্পীদের আরও সমৃদ্ধ ও ডুবে যাওয়ার মতো অভিজ্ঞতা তৈরির সুযোগ দেবে, কিন্তু গল্পকে আড়ালে ফেলে নয়।
তাহলে সিনেমা বানানো কি অনেক সহজ হয়ে যাবে?
সহজ হবে বলা যায়, কিন্তু সহজ মানেই কয়েকটি নির্দেশ লিখে পুরো সিনেমা তৈরি হয়ে যাবে, বিষয়টি এমন নয়।
বরং সময়সাপেক্ষ কিছু কাজ দ্রুত করা, বিশাল ডিজিটাল সংগ্রহ থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস খুঁজে বের করা এবং জটিল দৃশ্য তৈরিতে শিল্পীকে সহায়তা করাই এখন বেশি বাস্তবসম্মত ব্যবহার। এতে একজন শিল্পী প্রযুক্তিগত ছোটখাটো কাজে কম সময় দিয়ে গল্প, চরিত্র ও দৃশ্যের সৌন্দর্যে বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন।
AI এবং নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আরও সহজ বাংলায় খবর পড়তে TechnicalBD-এর AI News বিভাগ দেখতে পারেন।
সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা
সুবিধা: AI শিল্পীদের সময়সাপেক্ষ কিছু কাজ দ্রুত করতে পারে, বড় ডিজিটাল সংগ্রহ থেকে প্রয়োজনীয় উপকরণ খুঁজতে সাহায্য করতে পারে এবং জটিল simulation তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। CPU, GPU, স্থানীয় AI ও cloud একসঙ্গে ব্যবহার করলে প্রয়োজন অনুযায়ী কম্পিউটিং শক্তিও ভাগ করে নেওয়া সম্ভব।
সীমাবদ্ধতা: AMD ও Wētā FX-এর এই আলোচনা ভবিষ্যতের কাজের দিক নির্দেশ করছে। এখান থেকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না যে AI এখনই শিল্পী, animator বা visual effects বিশেষজ্ঞদের পুরো কাজ নিজে করতে পারে।
সাধারণ প্রশ্ন
Wētā FX কি ইতিমধ্যে AI ব্যবহার করছে?
হ্যাঁ। AMD-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি শিল্পীদের উপকরণ খুঁজে পেতে, কিছু উৎপাদন কাজ স্বয়ংক্রিয় করতে এবং জটিল simulation-এর কাজে AI ব্যবহার করছে।
ভবিষ্যতে কি শুধু GPU দিয়েই সিনেমার সব rendering হবে?
না। আলোচনায় বলা হয়েছে, সবচেয়ে জটিল কিছু rendering এখনো CPU-এর ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ভবিষ্যতে CPU, GPU, স্থানীয় AI ও cloud মিলিয়ে কাজ করার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
AI কি শিল্পীদের পুরোপুরি বদলে দেবে?
AMD-এর এই আলোচনায় এমন দাবি করা হয়নি। এখানে AI-কে মূলত শিল্পীর কাজের সহায়ক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
শেষ কথা
AI দিয়ে কয়েক সেকেন্ডে ছবি বা ছোট ভিডিও বানানো এখন আর খুব অচেনা বিষয় নয়। কিন্তু Wētā FX-এর মতো প্রতিষ্ঠানের কাজে AI যুক্ত হওয়ার অর্থ আরও বড়, কারণ এখানে প্রযুক্তিটি সরাসরি বিশাল সিনেমার জগৎ তৈরির পেছনের কাজকে সহজ করার চেষ্টা করছে।
ভবিষ্যতের সিনেমায় হয়তো আরও বড় জগৎ, আরও সূক্ষ্ম চরিত্র এবং বাস্তবের সঙ্গে পার্থক্য করা কঠিন এমন দৃশ্য দেখা যাবে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি সম্ভবত আগের মতোই থাকবে, প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, দর্শক শেষ পর্যন্ত একটি ভালো গল্পই মনে রাখেন।

