হোমএআই নিউজAI এসে কেড়ে নিল হাজারো মানুষের আয়ের পথ, বাংলাদেশের জন্যও কি সতর্কবার্তা?
ক্যাটেগরি:

AI এসে কেড়ে নিল হাজারো মানুষের আয়ের পথ, বাংলাদেশের জন্যও কি সতর্কবার্তা?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাজ কেড়ে নেবে কয়েক বছর আগেও কথাটা ছিল অনেকটা ভবিষ্যতের আশঙ্কা। কিন্তু আফ্রিকার দেশ কেনিয়ায় সেই পরিবর্তন ইতিমধ্যেই বাস্তব হয়ে উঠেছে। বিদেশি শিক্ষার্থীদের হয়ে প্রবন্ধ ও অ্যাসাইনমেন্ট লিখে যে হাজার হাজার মানুষ আয় করতেন, ChatGPT-এর মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আসার পর তাদের কাজের বাজারে বড় ধাক্কা লেগেছে।

Digital Trends-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কেনিয়ায় একসময় প্রায় ৪০ হাজার মানুষ এই অনলাইন লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্থানীয় চাকরির তুলনায় অনেকের আয়ও ছিল ভালো। কিন্তু শিক্ষার্থীরা নিজেরাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে লেখা তৈরি করতে শুরু করায় আগের মতো কাজ আর আসছে না।

ঘটনাটি শুধু কেনিয়ার নয়। বাংলাদেশেও অনলাইন লেখালেখি, তথ্য সংগ্রহ, অনুবাদ, ডিজাইনসহ নানা কাজ করে বহু মানুষ আয় করেন। আবার AI এখন শুধু লেখা তৈরিতে আটকে নেই TechnicalBD এর Claude নিজেই কম্পিউটার ব্যবহার করে কীভাবে কাজ করছে সেই প্রতিবেদনেও আমরা দেখেছি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ধীরে ধীরে মানুষের হয়ে একাধিক ধাপের কাজও করতে শুরু করেছে।

লেখালেখি থেকেই ভালো আয়ের পথ খুলেছিল

কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের হয়ে প্রবন্ধ, গবেষণাপত্র ও অ্যাসাইনমেন্ট লেখার বড় একটি অনলাইন বাজার গড়ে উঠেছিল। দেশটির অনেক বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ও শিক্ষিত তরুণের কাছে এটি সাধারণ চাকরির চেয়ে ভালো আয়ের সুযোগ তৈরি করেছিল।

Digital Trends এর প্রতিবেদনে তেরেসিওস বুন্ডি নামের একজন লেখকের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা বুন্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এই কাজ শুরু করেন। পরে প্রায় ১২ বছরে তিনি ২,৫০০টির বেশি প্রবন্ধ লিখেছিলেন।

একটি লেখার জন্য তিনি প্রায় ৪০ থেকে ৭০ ডলার পর্যন্ত পেতেন। ফলে নিজের পড়াশোনার বিষয়ের চাকরির চেয়েও অনলাইন লেখালেখি থেকে তার আয় বেশি হয়ে দাঁড়ায়। বুন্ডির মতো আরও অনেক তরুণের কাছেই এটি ধীরে ধীরে মূল পেশায় পরিণত হয়েছিল।

তবে কাজটির নৈতিক দিকও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। অন্য শিক্ষার্থীর হয়ে অ্যাসাইনমেন্ট বা প্রবন্ধ লিখে দেওয়া শিক্ষাক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু এই বাজারের পতন দেখাচ্ছে, সহজে স্বয়ংক্রিয় করা যায় এমন ডিজিটাল কাজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কত দ্রুত বদলে যেতে পারে।

ChatGPT আসার পর বদলে গেল হিসাব

২০২২ সালের শেষ দিকে ChatGPT সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছানোর পর বিদেশি শিক্ষার্থীদের সামনে নতুন একটি বিকল্প আসে। আগে যে লেখার জন্য অন্য কাউকে টাকা দিতে হতো, তার একটি খসড়া এখন কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা সম্ভব।

ফলে কেনিয়ার লেখকদের কাছে কাজ আসা কমতে থাকে। একই সঙ্গে কাজের পারিশ্রমিকেও চাপ পড়ে। যে খাতটি একসময় হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণের আয়ের পথ খুলেছিল, কয়েক বছরের ব্যবধানে সেটিই বড় সংকটের মুখে পড়ে।

এই পরিবর্তন এখন শুধু লেখালেখিতেও সীমাবদ্ধ নেই। তথ্য সংগ্রহ, সাধারণ অনুবাদ, ছবি সম্পাদনা কিংবা বারবার একইভাবে করতে হয় এমন অনেক ডিজিটাল কাজেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে। এমনকি ওয়েবসাইট পরিচালনার বিভিন্ন কাজেও AI ঢুকে পড়ছে, যেমন TechnicalBD এর WordPress-এ AI দিয়ে বিভিন্ন কাজ স্বয়ংক্রিয় করার নতুন সুবিধা নিয়ে আমাদের সাম্প্রতিক লেখায় দেখা গেছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ঝুঁকিটা কোথায়?

কেনিয়ার ঘটনা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখানেই। উন্নয়নশীল অনেক দেশে আন্তর্জাতিক অনলাইন কাজ স্থানীয় চাকরির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। ভালো দক্ষতা ও ইন্টারনেট থাকলে নিজের দেশে বসেই বিদেশি গ্রাহকের জন্য কাজ করে তুলনামূলক ভালো আয় করা সম্ভব।

কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের যৌথ গবেষণা বলছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কাজের পরিবর্তন বা বিঘ্ন আগে দেখা দিতে পারে, অথচ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সুবিধা পেতে সময় লাগতে পারে। গবেষণাটি ১৩৫টি দেশের শ্রমবাজার বিশ্লেষণ করেছে।

এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে উন্নয়নশীল দেশের অধিকাংশ চাকরি AI নিয়ে নেবে। বরং ডিজিটাল অবকাঠামো, দক্ষতা ও কাজের ধরনের পার্থক্যের কারণে একেক দেশে এর প্রভাব একেক রকম হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের World Development Report 2026 আরও আশাবাদী একটি দিকও দেখিয়েছে। তাদের হিসাবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে বর্তমানে প্রায় ৪.৫ শতাংশ চাকরি জেনারেটিভ AI দিয়ে স্বয়ংক্রিয় হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে উচ্চ আয়ের দেশে হারটি ১৪.২ শতাংশ।

অর্থাৎ AI শুধু কাজ কেড়ে নেওয়ার প্রযুক্তি নয়। সঠিক দক্ষতা, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকলে একই প্রযুক্তি উন্নয়নশীল দেশের মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বড় সুযোগও তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এখান থেকে শেখার আছে

বাংলাদেশের বাস্তবতায় কেনিয়ার ঘটনাটি বিশেষভাবে ভাবার মতো। আমাদের দেশেও ফ্রিল্যান্সিং ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য দূর থেকে কাজ করে আয়ের প্রতি তরুণদের আগ্রহ রয়েছে। লেখালেখি, সাধারণ গ্রাফিক ডিজাইন, তথ্য সংগ্রহ, অনুবাদ কিংবা বিভিন্ন পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের কিছু অংশ AI আগের তুলনায় অনেক দ্রুত করতে পারছে।

তার মানে এই নয় যে এসব পেশার সবাই কাজ হারাবেন। বরং একই কাজ করার পদ্ধতি বদলে যাবে এই সম্ভাবনাই বেশি। শুধু সাধারণ লেখা তৈরি করতে জানা একজনের তুলনায় যিনি গবেষণা, তথ্য যাচাই, সম্পাদনা এবং AI ব্যবহার করে আরও ভালো ফল বের করতে পারেন, তার প্রয়োজন থাকার সম্ভাবনাও বেশি।

একই পরিবর্তন আমরা অনলাইন আয়ের অন্য জায়গাতেও দেখছি। যেমন TechnicalBD এর YouTube ও Amazon-এর নতুন অংশীদারত্বে বাংলাদেশি নির্মাতাদের আয়ের সম্ভাবনা নিয়ে লেখায় দেখা গেছে, প্রযুক্তি পুরোনো আয়ের পথ বদলানোর পাশাপাশি নতুন পথও তৈরি করতে পারে।

তাই এখন শুধু একটি নির্দিষ্ট কাজ শেখার চেয়ে সেই কাজের সঙ্গে গবেষণা, বিশ্লেষণ, সমস্যা সমাধান এবং AI ব্যবহারের দক্ষতা যোগ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

AI কি তাহলে মানুষের চাকরি শেষ করে দেবে?

এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অন্তত তেমন সরল কোনো উত্তর দেয় না। কিছু কাজ স্বয়ংক্রিয় হচ্ছে, কিছু পেশার কাজের ধরন বদলাচ্ছে, আবার নতুন ধরনের কাজ ও সুযোগও তৈরি হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলো ঠিকভাবে প্রস্তুতি নিতে পারলে AI তাদের জন্য বড় অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি থাকলে সেই সুবিধা সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাবে না।

কেনিয়ার ঘটনা তাই শুধু ভয় পাওয়ার গল্প নয়; এটি প্রস্তুত হওয়ার সতর্কবার্তা। আজ যে একটি দক্ষতা দিয়ে ভালো আয় হচ্ছে, পাঁচ বছর পর একইভাবে সেই কাজটির চাহিদা থাকবে এমন নিশ্চয়তা এখন দেওয়া কঠিন।

সবচেয়ে ভালো পথ সম্ভবত AI এর সঙ্গে লড়াই করা নয়, AI কে নিজের দক্ষতার অংশ বানানো। কারণ প্রযুক্তি যত দ্রুত বদলাচ্ছে, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজের কাজকেও বদলে নেওয়ার ক্ষমতা।

কেনিয়ার হাজার হাজার অনলাইন লেখকের ঘটনা শেষ পর্যন্ত একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে এনেছে AI আমাদের কাজ নেবে কি না, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো AI এর যুগে আমরা নিজেদের কাজের মূল্য কীভাবে বাড়াব।

রাসেল আকন্দ
রাসেল আকন্দhttps://technicalbd.com
রাসেল আকন্দ TechnicalBD-এর লেখক ও সম্পাদক। তিনি স্মার্টফোন, কম্পিউটার, গ্যাজেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং দৈনন্দিন প্রযুক্তি নিয়ে সহজ ও তথ্যভিত্তিক বাংলায় লেখেন। নতুন প্রযুক্তির খবর যাচাই করে বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য ব্যবহারযোগ্যভাবে উপস্থাপন করাই তাঁর লেখার মূল লক্ষ্য।
সম্পর্কিত পোস্ট

জনপ্রিয় পোস্ট