কোম্পানি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে AI চালু করেনি, কিন্তু কর্মীরা নিজেরাই বিভিন্ন AI টুল দিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। জার্মানির নতুন গবেষণা দেখাচ্ছে, কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার অনেক ক্ষেত্রেই নিচ থেকে ওপরে ঘটছে।
University of Konstanz এর Future of Work Lab পরিচালিত সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, জার্মানির ৩৮ শতাংশ কর্মী বর্তমানে কাজে AI ব্যবহার করছেন। ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৩৫ শতাংশ, অর্থাৎ ব্যবহার বাড়লেও গতি তুলনামূলক ধীর।
AI এখন মানুষের হয়ে কতটা কাজ করতে পারে, সেটি বুঝতে TechnicalBD এর Claude Cowork নিয়ে প্রতিবেদন পড়তে পারেন। সেখানে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণ করে একাধিক ধাপের কাজ সম্পন্ন করার নতুন ক্ষমতা তুলে ধরা হয়েছে।
কর্মীরাই অনেক ক্ষেত্রে AI ব্যবহার শুরু করছেন
University of Konstanz এর প্রকাশিত গবেষণা তথ্যে বলা হয়েছে, AI ব্যবহারকারীদের মাত্র ৫৫ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত AI টুলটি প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছে। বাকিরা অনেক ক্ষেত্রেই নিজ উদ্যোগে ব্যবহার করছেন।
এই ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কর্মীরা AI নিয়ে পরীক্ষা শুরু করলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় নিয়ম, নিরাপদ অবকাঠামো এবং প্রশিক্ষণ এখনো সমান গতিতে তৈরি হয়নি। ফলে উৎপাদনশীলতার পাশাপাশি তথ্য সুরক্ষার প্রশ্নও সামনে আসছে।
সবাই সমানভাবে AI ব্যবহার করছেন না
গবেষণায় দেখা গেছে, অফিস এবং জ্ঞানভিত্তিক কাজে AI ব্যবহারের হার প্রায় ৪৯ শতাংশ। অন্যদিকে উৎপাদন বা সরাসরি হাতে কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের মধ্যে ব্যবহার প্রায় ২৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও পার্থক্য বড়। বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী কর্মীদের ৫৬ শতাংশ AI ব্যবহার করছেন, যেখানে তুলনামূলক কম শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মীদের মধ্যে হার মাত্র ২১ শতাংশ, যা নতুন ধরনের প্রযুক্তিগত বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়।
নিজের কম্পিউটারে AI চালিয়ে সংবেদনশীল তথ্য বাইরে পাঠানোর প্রয়োজন কমানোর প্রযুক্তিও দ্রুত বাড়ছে। TechnicalBD এর Perplexity Portable Computer প্রতিবেদন দেখায়, স্থানীয়ভাবে AI ব্যবহারের দিকে প্রতিষ্ঠানগুলো কেন গুরুত্ব দিচ্ছে।
প্রশিক্ষণেও বড় ঘাটতি রয়েছে
University of Konstanz জানিয়েছে, AI ব্যবহারকারী কর্মীদের প্রায় অর্ধেকই নিয়োগকর্তার কাছ থেকে AI ব্যবহারের প্রশিক্ষণ পাননি। ফলে কর্মীরা প্রযুক্তিটি ব্যবহার করলেও সঠিক নীতি, সীমাবদ্ধতা এবং নিরাপদ ব্যবহারের জ্ঞান সবার মধ্যে সমান নয়।
University of Konstanz এর অফিসিয়াল সামাজিক প্রকাশনাতেও গবেষকেরা বলেছেন, অনেক প্রতিষ্ঠানে AI পরিবর্তন পরিকল্পিতভাবে হচ্ছে না। কর্মীরা নিজে পরীক্ষা করছেন, আর প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ম, প্রশিক্ষণ ও নিরাপদ ব্যবস্থায় পিছিয়ে রয়েছে।
চাকরি হারানোর ভয় কতটা
গবেষণায় ৪০ শতাংশ কর্মী মনে করেন, আগামী দশ বছরে AI এবং অটোমেশন সামগ্রিক চাকরির বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু নিজের চাকরি হারানোর আশঙ্কা জানিয়েছেন তুলনামূলক কম, মাত্র ১৭ শতাংশ কর্মী।
অর্থাৎ সমাজের চাকরির বাজার নিয়ে উদ্বেগ ব্যক্তিগত চাকরির ভয় থেকে অনেক বেশি। গবেষকেরা মনে করছেন, মানুষ AI কে এখনো নিজের কর্মক্ষেত্রের তাৎক্ষণিক হুমকির চেয়ে বড় সামাজিক পরিবর্তন হিসেবেই বেশি দেখছেন।
AI নিরাপত্তা এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কেন এত আলোচনা হচ্ছে, সেটি জানতে TechnicalBD এর AI নিরাপত্তা বিতর্ক নিয়ে প্রতিবেদন পড়তে পারেন। সেখানে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।
কোম্পানির লাভেও এখনো বড় পরিবর্তন নেই
জরিপে মাত্র ২৩ শতাংশ কর্মী মনে করেন, AI ইতিমধ্যে তাদের প্রতিষ্ঠানের মূল্য তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। মাত্র ১২ শতাংশ বলেছেন, AI ব্যবহারের কারণে প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরির সংখ্যা কমেছে বলে তারা মনে করছেন।
এর মানে AI নিয়ে আলোচনার পরিমাণ বিশাল হলেও বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে এর অর্থনৈতিক প্রভাব এখনো কর্মীদের চোখে স্পষ্ট নয়। প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ছে, কিন্তু ব্যবসার কাঠামো পুরোপুরি বদলে গেছে এমন প্রমাণ গবেষণাটি দেয় না।
আগের আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও একই প্রবণতা দেখা গেছে
Microsoft ও LinkedIn এর Work Trend Index ২০২৪ সালে ৩১টি দেশের ৩১ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছিল, AI ব্যবহারকারীদের ৭৮ শতাংশ নিজেদের পছন্দের AI টুল কাজে ব্যবহার করছিলেন।
Microsoft এই প্রবণতার নাম দিয়েছিল BYOAI বা Bring Your Own AI। তবে ২০২৪ সালের আন্তর্জাতিক জরিপ এবং ২০২৬ সালের জার্মান গবেষণা আলাদা জনগোষ্ঠীর ওপর করা, তাই দুই শতাংশকে সরাসরি তুলনা করা ঠিক নয়।
Microsoft এর অফিসিয়াল ঘোষণায় বলা হয়েছিল, অনুমোদনহীন AI ব্যবহারে প্রতিষ্ঠানের তথ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে অনেক কর্মী জানিয়েছেন, AI তাদের সময় বাঁচাতে এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজে বেশি মনোযোগ দিতে সাহায্য করছে।
তথ্য সুরক্ষাই হতে পারে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
কোনো কর্মী ব্যক্তিগত AI অ্যাকাউন্টে প্রতিষ্ঠানের গোপন নথি, গ্রাহকের তথ্য অথবা অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা দিলে সেই তথ্য কোথায় যাচ্ছে এবং কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটি প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
এই কারণেই নিজের যন্ত্রে AI চালানোর প্রযুক্তির গুরুত্ব বাড়ছে। TechnicalBD এর ASUS এর স্থানীয় AI Agent প্রতিবেদন দেখায়, ব্যক্তিগত ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য নিজের কম্পিউটারে রেখেই AI দিয়ে কাজ করানোর চেষ্টা কীভাবে এগোচ্ছে।
বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রের জন্য কী শিক্ষা আছে
এই গবেষণা জার্মান কর্মীদের ওপর করা হয়েছে, তাই ফলাফলকে বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রের সরাসরি চিত্র বলা যাবে না। তবে নিজ উদ্যোগে ChatGPT বা অন্য AI ব্যবহারের ক্ষেত্রে তথ্য সুরক্ষা এবং প্রতিষ্ঠানের পরিষ্কার নীতি এখানেও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো AI নিষিদ্ধ করা বা পুরোপুরি অবাধ ব্যবহারের পরিবর্তে কোন তথ্য AI তে দেওয়া যাবে, অনুমোদিত টুল কোনগুলো এবং সংবেদনশীল তথ্য কীভাবে রক্ষা করতে হবে, সে বিষয়ে পরিষ্কার নিয়ম করতে পারে।
শেষ কথা
University of Konstanz এর গবেষণা দেখাচ্ছে, কর্মক্ষেত্রে AI বিপ্লব শুধু প্রতিষ্ঠানের ওপর থেকে দেওয়া পরিকল্পনায় ঘটছে না। অনেক কর্মী নিজে থেকেই নতুন টুল ব্যবহার করছেন, কিন্তু প্রশিক্ষণ ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এখনো পিছিয়ে রয়েছে।
AI ব্যবহার বাড়তেই থাকবে কি না, সেটি ভবিষ্যৎ গবেষণা বলবে। তবে বর্তমান ফলাফলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, কর্মীদের আগ্রহের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ এবং দায়িত্বশীল ব্যবহারের নীতি একই গতিতে এগোনো প্রয়োজন।

