ফোল্ডেবল বা ভাঁজ করা স্মার্টফোনের মূল আকর্ষণ হলো এক নিমেষে পকেটে রাখা ফোনকে ট্যাবলেটের মতো বড় স্ক্রিনে রূপান্তর করা। তবে শুরু থেকেই ফোল্ডেবল স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের একটি বড় আক্ষেপের জায়গা ছিল ডিসপ্লের ঠিক মাঝখানটায় থাকা ক্রিজ (Crease) বা ভাঁজের দাগ। বারবার ফোন খোলা বা বন্ধ করার ফলে ডিসপ্লের মাঝে একটি দৃশ্যমান ভাঁজের সৃষ্টি হতো, যা টাচ করার সময় বা ভিডিও দেখার সময় অস্বস্তি তৈরি করত।
এই সমস্যার স্থায়ী ও মেকানিক্যাল সমাধান নিয়ে এসেছে ডিসপ্লে প্রযুক্তির বিশ্বসেরা উদ্ভাবক স্যামসাং (Samsung)!
টেকনিক্যাল বিডি (Technical BD)-এর এই প্রতিবেদনে চলুন জেনে নেওয়া যাক স্যামসাংয়ের এই নতুন ও প্রায় ‘ক্রিজ-লেস’ (Crease-free) ফোল্ডেবল ডিসপ্লে কীভাবে কাজ করে এবং কীভাবে এর স্থায়িত্ব (Durability) বহুগুণ বাড়িয়ে তোলা হয়েছে।
১. ‘ওয়াটারড্রপ হিঞ্জ’ (Waterdrop Hinge) মেকানিজম
স্ক্রিনের মাঝখান থেকে ভাঁজের দাগ দূর করার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান হলো স্যামসাংয়ের উন্নত Flex Hinge বা ওয়াটারড্রপ হিঞ্জ সিস্টেমের:
-
টিয়ারড্রপ শেপ বেল্ডিং: ফোনটি বন্ধ করার সময় ডিসপ্লেটি একদম সোজা না ভেঙে কানের কাছে জলের ফোঁটার (Waterdrop) মতো গোল হয়ে ভেতরে গুটিয়ে যায়।
-
জিরো গ্যাপ ফোল্ডিং: এর ফলে ডিসপ্লের ওপর সরাসরি তীক্ষ্ণ চাপ পড়ে না, ফলে স্ক্রিন খুললে মাঝখানের দাগ আর আগের মতো স্পষ্ট বা দৃশ্যমান মনে হয় না। এছাড়া ভাঁজ করা অবস্থায় দুই প্যানেলের মাঝে কোনো ফাঁকা জায়গা থাকে না।
২. আল্ট্রা-থিন গ্লাস (UTG) ও আর্মার অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেম
ডিসপ্লে যাতে বারবার ভাঁজ করলেও দীর্ঘদিন অক্ষত থাকে, সেজন্য স্যামসাং ব্যবহার করেছে অত্যাধুনিক ম্যাটেরিয়ালস:
-
New Generation UTG (Ultra Thin Glass): মানুষের চুলের চেয়েও পাতলা এই বিশেষ কাঁচ কেবল নমনীয়ই নয়, বরং এটি নখ বা যেকোনো ঘষাঘষি থেকে স্ক্রিনকে রক্ষা করে।
-
ডাস্ট ও ওয়াটার রেসিস্ট্যান্স (IP Rating): ফোল্ডেবল বডির ভেতরে ধুলাবালি বা পানি যাতে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য হিঞ্জ মেকানিজমে ব্যবহার করা হয়েছে ক্ষুদ্র ব্রাশ ফাইবার এবং পানি নিরোধক কোটিং।
৩. ডিসপ্লে প্রসেসিং ও ভিউয়িং এক্সপেরিয়েন্স
-
একদম ফ্ল্যাট সারফেস: নতুন এই প্যানেল প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ার ফলে গেমিং করা, ব্রাউজ করা কিংবা এস-পেন (S Pen) দিয়ে ড্রয়িং করার সময় মাঝখানের কোনো উঁচু-নিচু অংশ অনুভব করা যায় না।
-
হাই ব্রাইটনেস ও প্রফেশনাল কালার রিপ্রোডাকশন: এটি ৩,০০০ নিটস (Nits) পর্যন্ত ব্রাইটনেস সাপোর্ট করতে পারে, ফলে কড়া রোদের মধ্যেও ডিসপ্লের বিষয়বস্তু ক্রিস্টাল ক্লিয়ার দেখা যায়।
৪. ফোল্ডেবল প্রযুক্তির অতীত বনাম বর্তমান
| বিষয় | আগের ফোল্ডেবল প্রযুক্তি | স্যামসাংয়ের নতুন ফোল্ডেবল ডিসপ্লে |
| মাঝখানের ভাঁজ (Crease) | সহজে দৃশ্যমান ও আঙুলে অনুভব করা যেত | প্রায় অদৃশ্য এবং ফ্ল্যাট টাচ ফিলিং |
| ফোল্ডিং গ্যাপ | বন্ধ করলে মাঝখানে ফাঁকা থাকত | একদম গ্যাপ-লেস ফ্ল্যাট ফোল্ড |
| স্থায়িত্ব (Durability) | ১-২ লাখ ফোল্ডের পর দাগ স্পষ্ট হতো | ৪ লাখেরও বেশি ফোল্ড সহনশীল |
সাধারণ কিছু প্রশ্ন (FAQs)
প্রশ্ন ১: স্যামসাংয়ের নতুন ফোল্ডেবল স্ক্রিনে কি স্ক্রিন প্রোটেক্টর ব্যবহার করা লাগে?
উত্তর: না, স্যামসাং ফ্যাক্টরি থেকেই আল্ট্রা-থিন গ্লাসের ওপর উন্নত কোটিং দিয়ে পাঠায়। থার্ড-পার্টি কাস্টম প্রোটেক্টর না লাগানোই ভালো।
প্রশ্ন ২: নতুন এই ফোল্ডেবল ফোনগুলো কি পানির নিচে ব্যবহারে নিরাপদ?
উত্তর: এই ফোনগুলোতে IPX8 ওয়াটার রেসিস্ট্যান্স থাকে, যা নির্দিষ্ট গভীরতার পানিতে ফোন ডুবে গেলেও ক্ষতি হতে দেয় না। তবে ধুলোবালি থেকে সুরক্ষার জন্য অতিরিক্ত যত্ন নেওয়া প্রয়োজন।
শেষ কথা
স্যামসাংয়ের এই নতুন ‘ক্রিজ-লেস’ ফোল্ডেবল ডিসপ্লে স্মার্টফোন ডিজাইনের ইতিহাসে এক বিরাট অগ্রগতি। ডিসপ্লের স্থায়ী নমনীয়তা ও ফ্ল্যাট সারফেস ব্যবহারের অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে ফোল্ডেবল স্মার্টফোনকে সাধারণ স্মার্টফোনের মতোই জনপ্রিয় ও টেকসই করে তুলেছে স্যামসাং।
স্যামসাংয়ের এই নতুন ফোল্ডেবল ডিসপ্লে প্রযুক্তি সম্পর্কে আপনার মতামত কী? কমেন্ট করে জানান এবং টেকপ্রেমী বন্ধুদের সাথে ব্লগটি শেয়ার করুন!


