হোমকম্পিউটারপ্রিন্টিং প্রযুক্তিতে তৈরি OLED মনিটর আনল MSI, বদলে যেতে পারে ডিসপ্লে তৈরির...
ক্যাটেগরি:

প্রিন্টিং প্রযুক্তিতে তৈরি OLED মনিটর আনল MSI, বদলে যেতে পারে ডিসপ্লে তৈরির পদ্ধতি

OLED মনিটর এখন আর নতুন কিছু নয়। কিন্তু MSI এমন একটি মনিটর এনেছে, যার OLED প্যানেল তৈরির পদ্ধতিটাই আলাদা। নতুন MSI PRO MAX OLED 271UPJW12 মডেলে ব্যবহার করা হয়েছে Inkjet Printed OLED প্রযুক্তি, যেখানে বিশেষ প্রিন্টিং পদ্ধতিতে OLED এর আলো তৈরি করা উপাদান প্যানেলের নির্দিষ্ট জায়গায় বসানো হয়। MSI এর অফিসিয়াল ঘোষণা

শুনতে অনেকটা সাধারণ প্রিন্টারের মতো মনে হলেও এখানে কাগজে কালি দিয়ে ছবি ছাপানো হচ্ছে না। বরং OLED প্যানেল তৈরির সময় লাল, সবুজ ও নীল আলো তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ জৈব উপাদান অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে নির্দিষ্ট স্থানে জমা করা হচ্ছে। এখানেই নতুন প্রযুক্তিটির মূল পার্থক্য।

Inkjet Printed OLED আসলে কী

সাধারণ ইঙ্কজেট প্রিন্টারে একটি প্রিন্ট হেড কাগজের নির্দিষ্ট জায়গায় অতি ক্ষুদ্র কালি ফোঁটা বসায়। Inkjet Printed OLED তৈরির ধারণাটাও কিছুটা একই, তবে এখানে সাধারণ কালি ব্যবহার করা হয় না। ব্যবহার করা হয় এমন বিশেষ তরল উপাদান, যা পরে OLED পিক্সেলের আলো তৈরিতে কাজ করে।

অর্থাৎ, প্রিন্ট করা হচ্ছে OLED প্যানেল তৈরির উপাদান, পর্দায় দেখা ছবি নয়। এই একটি কথা মনে রাখলেই প্রযুক্তিটি বোঝা অনেক সহজ হয়ে যায়। TCL CSOT বহু বছর ধরে এই পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে এবং বর্তমানে এটি বাস্তব পণ্যে ব্যবহারের পর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করেছে। TCL CSOT এর IJP OLED প্রযুক্তি সম্পর্কে তথ্য

কেন এই পদ্ধতি এত গুরুত্বপূর্ণ

OLED প্যানেল তৈরির প্রচলিত কিছু পদ্ধতিতে আলো তৈরির উপাদান অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে প্যানেলের ওপর বসাতে হয়। Inkjet Printing ব্যবহারের লক্ষ্য হলো প্রয়োজনীয় উপাদানকে আরও নির্দিষ্টভাবে বসানো, যাতে উৎপাদনের সময় উপাদানের ব্যবহার আরও কার্যকর করা সম্ভব হয় এবং প্যানেল তৈরির প্রক্রিয়াও নমনীয় হতে পারে।

TCL CSOT জানিয়েছে, তাদের IJP OLED প্রযুক্তিতে উপাদান ব্যবহারের দক্ষতা ৯০ শতাংশের বেশি হতে পারে। কোম্পানিটি প্রচলিত OLED উৎপাদনের তুলনায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর দাবিও করেছে। তবে ভবিষ্যতে এর ফলে মনিটরের দাম কতটা কমবে, সেটি এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

27 ইঞ্চির পর্দায় 4K এবং 120Hz

MSI PRO MAX OLED 271UPJW12 এ রয়েছে 27 ইঞ্চির 4K পর্দা এবং 120Hz রিফ্রেশ রেট। এর পিক্সেল ঘনত্ব 164 PPI, ফলে একই আকারের কম রেজোলিউশনের মনিটরের তুলনায় লেখা, ছবি এবং ছোট ছোট অংশ অনেক বেশি পরিষ্কার দেখানোর কথা।

4K মনিটর আসলে কতটা বাড়তি বিস্তারিত দেখাতে পারে এবং QHD বা 5K এর সঙ্গে এর পার্থক্য কোথায়, সেটি বুঝতে চাইলে TechnicalBD এর QHD, WQHD, 4K ও 5K রেজোলিউশন গাইড পড়তে পারেন। সেখানে পিক্সেল সংখ্যা এবং ব্যবহারের পার্থক্য সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

RGB Stripe কেন গুরুত্বপূর্ণ

এই মনিটরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো RGB Stripe সাবপিক্সেল বিন্যাস। এখানে লাল, সবুজ ও নীল সাবপিক্সেল নিয়মিতভাবে পাশাপাশি সাজানো থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো ছোট লেখা এবং ছবির সূক্ষ্ম অংশকে আরও পরিষ্কার দেখানো এবং রঙের কিনারায় অস্বাভাবিক ছাপ কমানো।

OLED পর্দায় গভীর কালো এবং বেশি Contrast এমনিতেই বড় সুবিধা। এর সঙ্গে পরিষ্কার টেক্সট যোগ হলে অফিসের কাজ, ওয়েব ব্রাউজিং, ছবি সম্পাদনা এবং ভিডিও দেখার মতো বিভিন্ন কাজে একটি OLED মনিটর আরও ব্যবহারযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।

OLED ডিসপ্লে বাস্তবে কেমন সুবিধা দেয়, তার আরেকটি উদাহরণ TechnicalBD এর Alienware 16X Aurora OLED ডিসপ্লে নিয়ে বিস্তারিত লেখা থেকে দেখা যেতে পারে। সেখানে OLED এর গভীর কালো এবং দ্রুত রিফ্রেশ রেটের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

রঙের কাজেও শক্তিশালী

MSI এর তথ্য অনুযায়ী, নতুন মনিটরটি DCI P3 রঙের পরিসরের 99 শতাংশ পর্যন্ত দেখাতে পারে এবং রঙের নির্ভুলতার ক্ষেত্রে Delta E দুই বা তার কম রাখার দাবি করা হয়েছে। ফলে শুধু বিনোদন নয়, ছবি ও ভিডিও সম্পাদনার মতো কাজেও এটি লক্ষ্য করা হচ্ছে।

মনিটরটি VESA DisplayHDR True Black 500 সনদ পেয়েছে এবং HDR দৃশ্যে সর্বোচ্চ 1000 nits পর্যন্ত উজ্জ্বলতা দিতে পারে বলে MSI জানিয়েছে। VESA এর True Black মান বিশেষভাবে OLED এর মতো গভীর কালো দেখাতে সক্ষম ডিসপ্লের HDR কার্যক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য তৈরি। VESA DisplayHDR মান সম্পর্কে বিস্তারিত

শুধু গেমিং নয়, কাজের জন্যও তৈরি

120Hz রিফ্রেশ রেট থাকায় দ্রুত দৃশ্য স্বাভাবিক 60Hz মনিটরের তুলনায় মসৃণ দেখাবে। তবে MSI এটিকে শুধু গেমিং মনিটর হিসেবে তৈরি করেনি। KVM, PIP, PBP এবং USB C সংযোগসহ একাধিক কাজের সুবিধাও এতে রাখা হয়েছে।

একটি কম্পিউটার দিয়ে উচ্চ রেজোলিউশন ও বেশি রিফ্রেশ রেটের মনিটর চালানোর বিষয়টি নির্ভর করে ডিভাইসের Display Support এর ওপর। উদাহরণ হিসেবে TechnicalBD এর M6 Mac mini এর 4K 165Hz Display Support বিষয়ক লেখা দেখে বিষয়টি আরও সহজে বোঝা যাবে।

OLED প্যানেল সুরক্ষায় নতুন ব্যবস্থা

OLED প্যানেলে দীর্ঘ সময় একই ছবি থাকলে স্থায়ী ছাপ বা burn in নিয়ে ব্যবহারকারীদের উদ্বেগ থাকে। MSI এই মডেলে OLED Auto Care নামের একটি ব্যবস্থা দিয়েছে, যা পটভূমিতে প্যানেলের ব্যবহারের তথ্য হিসাব করে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।

MSI এর দাবি অনুযায়ী, এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো কাজের মাঝখানে বারবার প্যানেল রক্ষণাবেক্ষণের বার্তা দেখানো ছাড়াই OLED সুরক্ষা চালিয়ে যাওয়া। দীর্ঘদিন বাস্তব ব্যবহারের স্বাধীন পরীক্ষা পাওয়া গেলে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যাবে।

চোখের আরামের দিকেও নজর

মনিটরটিতে হার্ডওয়্যার ভিত্তিক কম নীল আলো এবং Flicker Free প্রযুক্তি রয়েছে। MSI আরও জানিয়েছে, এটি Eyesafe 3.0 এর প্রয়োজনীয়তা পূরণ করে এবং ক্ষতিকর নীল আলোর নির্দিষ্ট অংশ সীমিত করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে।

Eyesafe এর Display Requirements 3.0 ডিসপ্লের নীল আলো, রঙের মান এবং Circadian প্রভাব পরিমাপের জন্য নির্দিষ্ট মান ব্যবহার করে। এসব সনদের অর্থ কী, সেটি Eyesafe এর অফিসিয়াল Display Requirements 3.0 তথ্য থেকে বিস্তারিত জানা যায়।

Samsung এর 6K মনিটরের সঙ্গে পার্থক্য কোথায়

বর্তমানে মনিটর বাজারে শুধু OLED প্রযুক্তিতেই পরিবর্তন হচ্ছে না, রেজোলিউশন এবং রিফ্রেশ রেট নিয়েও প্রতিযোগিতা চলছে। Samsung এর নতুন Odyssey G8 এর মতো মডেলে ইতিমধ্যে 6K রেজোলিউশন এবং 165Hz পর্যন্ত রিফ্রেশ রেট দেখা যাচ্ছে।

তবে দুই পণ্যের লক্ষ্য এক নয়। Samsung এর মডেলটি উচ্চ রেজোলিউশনকে সামনে রাখছে, যেখানে MSI এর এই মডেলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো IJP OLED প্যানেল তৈরির নতুন পদ্ধতি। চাইলে Samsung Odyssey G8 6K মনিটরের বিস্তারিত বিশ্লেষণ দেখে দুই প্রযুক্তির পার্থক্য বোঝা যাবে।

বাংলাদেশে পাওয়া যাবে কি

MSI এর অফিসিয়াল ঘোষণায় এখনো বাংলাদেশের জন্য নির্দিষ্ট মূল্য বা বাজারে আসার সময় জানানো হয়নি। তাই বিদেশি মূল্যকে সরাসরি টাকায় রূপান্তর করে বাংলাদেশি সম্ভাব্য দাম দেখানো ঠিক হবে না। দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে এলে পরিবেশক, কর এবং ওয়ারেন্টির কারণে মূল্য আলাদা হতে পারে।

বাংলাদেশের ব্যবহারকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে অফিসিয়াল ওয়ারেন্টি এবং স্থানীয় বিক্রয় সুবিধা। নতুন ধরনের OLED প্রযুক্তি হওয়ায় শুধু দাম নয়, প্যানেল ওয়ারেন্টি এবং burn in সংক্রান্ত শর্ত ভালোভাবে যাচাই করেই কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

এই মনিটরের আসল গুরুত্ব কোথায়

MSI PRO MAX OLED 271UPJW12 কে শুধু আরেকটি 4K OLED মনিটর হিসেবে দেখলে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি বাদ পড়ে যাবে। এখানে আসল পরিবর্তন হচ্ছে OLED তৈরির পদ্ধতিতে, যেখানে প্রিন্টিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে আলো তৈরি করা উপাদান প্যানেলের ওপর নির্দিষ্টভাবে বসানো হচ্ছে।

এই প্রযুক্তি যদি বড় পরিসরে সফলভাবে উৎপাদন করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতের OLED মনিটর তৈরিতে উপাদানের ব্যবহার, উৎপাদনের নমনীয়তা এবং খরচের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে কম দামের OLED এখনই নিশ্চিত বাস্তবতা নয়, বরং IJP OLED সেই সম্ভাবনার দিকে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ।

রাসেল আকন্দ
রাসেল আকন্দhttps://technicalbd.com
রাসেল আকন্দ TechnicalBD-এর লেখক ও সম্পাদক। তিনি স্মার্টফোন, কম্পিউটার, গ্যাজেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং দৈনন্দিন প্রযুক্তি নিয়ে সহজ ও তথ্যভিত্তিক বাংলায় লেখেন। নতুন প্রযুক্তির খবর যাচাই করে বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য ব্যবহারযোগ্যভাবে উপস্থাপন করাই তাঁর লেখার মূল লক্ষ্য।
সম্পর্কিত পোস্ট

জনপ্রিয় পোস্ট