ভাঁজযোগ্য স্মার্টফোনের বাজারে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী এসেছে। দীর্ঘদিন বিভিন্ন প্রোটোটাইপ ও ফাঁস হওয়া ছবিতে দেখা যাওয়ার পর Xiaomi 18 Fold এখন আনুষ্ঠানিক পণ্য, যেখানে বড় ভাঁজযোগ্য পর্দা, নিজস্ব XRing O3 প্রসেসর এবং 200MP ক্যামেরা রয়েছে।
শাওমির অফিশিয়াল স্টোর অনুযায়ী, ফোনটির দাম চীনে 10,999 ইউয়ান থেকে শুরু। এতে 7.58 ইঞ্চির ভেতরের পর্দা, 5.38 ইঞ্চির বাইরের পর্দা এবং Leica ভিত্তিক তিন ক্যামেরার ব্যবস্থা রয়েছে।
ভাঁজযোগ্য ফোন এখন শুধু নতুনত্ব দেখানোর পণ্য নয়। স্যামসাং গ্যালাক্সি Z Fold8 ও Fold8 Ultra তুলনায় দেখা যায়, বড় পর্দা, ক্যামেরা ও দৈনন্দিন ব্যবহারের সুবিধাই এখন এই বাজারে মূল পার্থক্য তৈরি করছে।
Xiaomi 18 Fold-এর প্রধান তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| ভেতরের পর্দা | 7.58 ইঞ্চি |
| বাইরের পর্দা | 5.38 ইঞ্চি |
| প্রসেসর | Xiaomi XRing O3 |
| মূল ক্যামেরা | 200MP |
| টেলিফটো ক্যামেরা | 50MP |
| আল্ট্রা ওয়াইড ক্যামেরা | 50MP |
| ব্যাটারি | 6000mAh |
| তারযুক্ত চার্জিং | 67W |
| ওয়্যারলেস চার্জিং | 50W |
| শুরুর দাম | 10,999 ইউয়ান |
আগের ফাঁস হওয়া নকশা কতটা মিলেছে
আগের প্রোটোটাইপ ছবিতে যে চওড়া ভাঁজযোগ্য নকশা দেখা গিয়েছিল, চূড়ান্ত Xiaomi 18 Fold-এও সেই ধারণা অনেকটাই আছে। ফোনটি বন্ধ অবস্থায় তুলনামূলক ছোট, আর খুললে ছোট ট্যাবলেটের মতো বড় কাজের জায়গা পাওয়া যায়।
শাওমি কমিউনিটিতে প্রকাশিত অফিশিয়াল ছবিতে সমান সরু বেজেল, গোলাকার কোণা এবং পেছনে লম্বাটে ক্যামেরা অংশ দেখা যায়। তবে ফাঁস হওয়া ছবির সঙ্গে মেলানোর চেয়ে চূড়ান্ত পণ্যের তথ্যই বেশি কাজের।
এর আগে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ফোনটির নকশাকে সম্ভাব্য অ্যাপেল ফোল্ডেবলের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল। এখন অ্যাপেলের প্রথম ভাঁজযোগ্য আইফোন ডুও আনুষ্ঠানিক হওয়ায় দুই প্রতিষ্ঠানের পণ্য বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতেই তুলনা করা যায়।
দুই পর্দা কী সুবিধা দেবে
Xiaomi 18 Fold-এর ভেতরের পর্দা 7.58 ইঞ্চি, আর বাইরের পর্দা 5.38 ইঞ্চি। কোম্পানির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভেতরের পর্দায় 2:1 অনুপাত ব্যবহার করা হয়েছে, যা পাশাপাশি একাধিক কাজ করার জন্য বেশি জায়গা দেয়।
ফোন বন্ধ থাকলে বাইরের পর্দা দিয়ে বার্তা দেখা, কল করা বা সাধারণ কাজ করা যাবে। বড় জায়গার প্রয়োজন হলে ফোন খুলে ভিডিও দেখা, নথি পড়া অথবা একই সঙ্গে একাধিক অ্যাপ ব্যবহার করা সহজ হবে।
ভাঁজযোগ্য পর্দা বাস্তবে কার জন্য বেশি কাজে লাগে, তা বুঝতে আইফোন ডুও ও আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্স তুলনা দেখা যেতে পারে। সেখানে বড় পর্দার সুবিধার পাশাপাশি প্রচলিত ফোনের বাস্তব সুবিধাও তুলনা করা হয়েছে।
XRing O3 প্রসেসর
Xiaomi 18 Fold-এ প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব XRing O3 প্রসেসর ব্যবহার করা হয়েছে। অফিশিয়াল স্টোরে এটিকে ফোনটির প্রধান বৈশিষ্ট্যের একটি হিসেবে সরাসরি দেখানো হচ্ছে, তাই প্রোটোটাইপের সময় প্রসেসর নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল, তা এখন কেটে গেছে।
নিজস্ব প্রসেসর ব্যবহার করলে শাওমি হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারকে আরও কাছাকাছি সমন্বয় করার সুযোগ পায়। তবে XRing O3 বাস্তবে Snapdragon বা অন্য ফ্ল্যাগশিপ চিপের তুলনায় কেমন, সেটি স্বাধীন বেঞ্চমার্ক ও দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষায় পরিষ্কার হবে।
তাই শুধু শাওমির পারফরম্যান্স দাবি দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়াই ভালো। বিশেষ করে গেমিং, দীর্ঘ সময় ক্যামেরা ব্যবহার এবং বড় পর্দায় একসঙ্গে একাধিক কাজের সময় প্রসেসর কতটা স্থির কর্মক্ষমতা দেয়, সেটিই আসল বিষয়।
200MP Leica ক্যামেরা
পেছনে রয়েছে Leica ভিত্তিক তিনটি ক্যামেরা। শাওমির অফিশিয়াল স্টোর অনুযায়ী, মূল ক্যামেরা 200MP, সঙ্গে 50MP টেলিফটো এবং 50MP আল্ট্রা ওয়াইড ক্যামেরা রয়েছে। ভাঁজযোগ্য ফোন হিসেবেও ক্যামেরার জায়গায় শাওমি বড় ছাড় দেয়নি।
শাওমি কমিউনিটিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, টেলিফটো ক্যামেরায় 3.5x অপটিক্যাল জুম রয়েছে। তবে ক্যামেরার মান শুধু মেগাপিক্সেল দিয়ে ঠিক হয় না, সেন্সর, প্রসেসিং, লেন্স এবং সফটওয়্যার টিউনিং বাস্তব ছবির মানে বড় ভূমিকা রাখে।
ক্যামেরার জায়গাতেই অনেক ভাঁজযোগ্য ফোনের মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। গ্যালাক্সি Z Fold8 ও Fold8 Ultra তুলনায়ও দেখা যায়, 200MP ক্যামেরা ও টেলিফটো সুবিধা প্রিমিয়াম মডেল বেছে নেওয়ার বড় কারণ হতে পারে।
6000mAh ব্যাটারি ও দ্রুত চার্জিং
শাওমির অফিশিয়াল স্টোর সরাসরি 6000mAh ব্যাটারি নিশ্চিত করছে। শাওমি কমিউনিটিতে শাওমি ও Lei Jun-এর তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত পোস্টে 67W তারযুক্ত এবং 50W ওয়্যারলেস চার্জিংয়ের কথাও জানানো হয়েছে।
ভাঁজযোগ্য ফোনে বড় ব্যাটারি জরুরি, কারণ দুটি পর্দা এবং শক্তিশালী প্রসেসর একসঙ্গে বেশি শক্তি ব্যবহার করতে পারে। তবে 6000mAh লেখা থাকলেই ব্যাটারি ব্যাকআপ অসাধারণ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই, কারণ ব্যবহারভেদে ফল বদলায়।
উচ্চ ব্রাইটনেস, ক্যামেরা, গেমিং এবং একই সঙ্গে একাধিক অ্যাপ ব্যবহার করলে ব্যাটারি দ্রুত কমতে পারে। তাই ফোনটি দীর্ঘদিন ব্যবহার করার পর স্বাধীন পরীক্ষায় পাওয়া ব্যাটারি ফল কেনার সিদ্ধান্তে বেশি কাজে দেবে।
ভাঁজযোগ্য নকশায় স্থায়িত্ব কতটা গুরুত্বপূর্ণ
ভাঁজযোগ্য ফোনের ক্ষেত্রে শুধু ডিসপ্লের আকার বা প্রসেসর দেখলে চলবে না। কবজা, ভেতরের নমনীয় পর্দা এবং দীর্ঘদিন খোলা-বন্ধ করার পর ভাঁজের দাগ বা ডিসপ্লে কেমন থাকে, সেটিও দেখা দরকার।
এ কারণেই প্রথম প্রজন্মের বা নতুন নকশার ফোল্ডেবল কেনার সময় ওয়ারেন্টি ও মেরামতের সুবিধা বেশি গুরুত্ব পায়। ভাঁজযোগ্য আইফোনের জন্য অ্যাপেলের Pencil prototype সম্পর্কিত প্রতিবেদনেও বড় ভাঁজযোগ্য পর্দাকে নতুনভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা দেখা গেছে।
শাওমি নতুন কবজা ব্যবস্থাকে ফোনটির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে কয়েক মাস বা কয়েক বছর ব্যবহারের পর এর স্থায়িত্ব কেমন থাকে, তা বাস্তব ব্যবহারেই বোঝা যাবে।
দাম কত
অফিশিয়াল স্টোর অনুযায়ী, Xiaomi 18 Fold-এর শুরুর দাম 10,999 ইউয়ান। বিভিন্ন র্যাম ও স্টোরেজ সংস্করণে দাম বাড়ে, তবে বাংলাদেশে এখনো প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক স্থানীয় দাম ঘোষণা হয়নি।
চীনের দাম টাকায় রূপান্তর করলেই বাংলাদেশের খুচরা দাম পাওয়া যায় না। দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে না এলে আমদানি খরচ, কর, বিক্রেতার লাভ এবং ওয়ারেন্টি ব্যবস্থার কারণে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হতে পারে।
তাই বাংলাদেশে কোনো দোকানে ফোনটি দেখা গেলে প্রথমেই জানতে হবে সেটি অফিশিয়াল নাকি আনঅফিশিয়াল ইমপোর্ট, কোন অঞ্চলের সফটওয়্যার চলছে এবং ওয়ারেন্টি বা ডিসপ্লে মেরামতের ব্যবস্থা কীভাবে পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশি ব্যবহারকারীদের কী জানা প্রয়োজন
বাংলাদেশে Xiaomi 18 Fold কেনার ক্ষেত্রে শুধু হার্ডওয়্যার স্পেসিফিকেশন যথেষ্ট নয়। চায়না ভার্সন হলে গুগল সার্ভিস, ভাষা, নেটওয়ার্ক ব্যান্ড, আপডেট এবং কিছু এআই ফিচারের ব্যবহারে গ্লোবাল মডেলের তুলনায় পার্থক্য থাকতে পারে।
এ কারণে আনঅফিশিয়াল ইমপোর্ট কেনার আগে ব্যবহৃত সফটওয়্যার ভার্সন এবং বাংলাদেশের মোবাইল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা জরুরি। ভাঁজযোগ্য ডিসপ্লে ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্থানীয়ভাবে রিপ্লেসমেন্ট পাওয়া যাবে কি না, সেটিও আগে জানা ভালো।
বাংলাদেশে শাওমি আনুষ্ঠানিকভাবে ফোনটি আনলে স্থানীয় ওয়ারেন্টি ও সফটওয়্যার সাপোর্ট পরিষ্কার হবে। তার আগে বেশি দাম দিয়ে ইমপোর্ট করা ইউনিট কেনার ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্ক থাকাই ভালো।
Xiaomi 18 Fold কার জন্য বেশি উপযুক্ত
যারা বড় পর্দায় ভিডিও দেখা, নথি পড়া এবং পাশাপাশি একাধিক অ্যাপ ব্যবহার করেন, তাদের কাছে Xiaomi 18 Fold সাধারণ স্মার্টফোনের তুলনায় আলাদা সুবিধা দিতে পারে।
200MP ক্যামেরা, বড় ব্যাটারি এবং XRing O3 প্রসেসর থাকায় এটি শুধু বড় পর্দার ফোন নয়। শাওমি এটিকে সরাসরি উচ্চমানের ফ্ল্যাগশিপ ফোল্ডেবল হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে।
অন্যদিকে যারা মূলত কল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ছবি তোলা এবং সাধারণ দৈনন্দিন কাজ করেন, তাদের জন্য প্রচলিত ফ্ল্যাগশিপ ফোন কম দামে সহজ ও বেশি নির্ভরযোগ্য পছন্দ হতে পারে।
শেষ কথা
Xiaomi 18 Fold এখন আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রি হচ্ছে, আর অফিশিয়াল স্টোর থেকেই XRing O3, 200MP ক্যামেরা, 7.58 ইঞ্চির ভেতরের পর্দা ও 6000mAh ব্যাটারি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে।
ফাঁস হওয়া ছবির সঙ্গে চূড়ান্ত নকশার কিছু মিল আছে, তবে ফোনটি বুঝতে এখন বর্তমান স্পেসিফিকেশন আর বাস্তব ব্যবহারের অভিজ্ঞতাই বেশি কাজে দেবে।
বাংলাদেশি ক্রেতাদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো অফিশিয়াল প্রাপ্যতা, স্থানীয় ওয়ারেন্টি এবং সফটওয়্যার সাপোর্ট। এসব পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত আনঅফিশিয়াল ইমপোর্ট কিনতে চাইলে দাম ও স্পেসিফিকেশনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সাপোর্ট ও মেরামতের সুবিধাও বিবেচনা করা উচিত।
সর্বশেষ আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২৬

