হোমপিসি কম্পোনেন্টসপ্রসেসরের বর্জ্য তাপ দিয়েই ঠান্ডা করার নতুন প্রযুক্তি, কীভাবে কাজ করে এই...

প্রসেসরের বর্জ্য তাপ দিয়েই ঠান্ডা করার নতুন প্রযুক্তি, কীভাবে কাজ করে এই সলিড স্টেট কুলার

কম্পিউটারের প্রসেসর যত শক্তিশালী হচ্ছে, সেটিকে ঠান্ডা রাখার চ্যালেঞ্জও তত বাড়ছে। সাধারণত এই তাপ সরাতে ফ্যান, হিটসিঙ্ক কিংবা তরল কুলিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু গবেষকেরা এবার এমন একটি প্রযুক্তি দেখিয়েছেন, যেখানে ফেলে দেওয়া তাপকেই আবার শীতলীকরণের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।

জার্মানির Karlsruhe Institute of Technology এবং জাপানের University of Tsukuba এর গবেষকেরা এমন একটি সলিড স্টেট কুলিং ব্যবস্থা তৈরি করেছেন, যা তাপকে প্রথমে যান্ত্রিক শক্তিতে এবং পরে সেই শক্তিকে শীতলীকরণে রূপান্তর করতে পারে।

গবেষণাটি ২৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখে Nature Energy তে প্রকাশিত মূল গবেষণায় বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। পরে ৯ সেপ্টেম্বর Nature Energy প্রকাশিত Research Briefing এ প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা আরও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

তাপ থেকেই কীভাবে ঠান্ডা তৈরি হচ্ছে

প্রযুক্তিটির মূল রহস্য দুটি অত্যন্ত পাতলা Shape Memory Alloy বা আকৃতি মনে রাখতে সক্ষম বিশেষ ধাতব স্তরে।

প্রথমটি ২২ মাইক্রোমিটার পুরু TiNi ফিল্ম। তাপ প্রয়োগ করলে এটি আগের আকৃতিতে ফেরার চেষ্টা করে এবং যান্ত্রিক বল তৈরি করে। ফলে আলাদা বৈদ্যুতিক মোটরের প্রয়োজন কমানো সম্ভব হয়।

এই ফিল্মের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ২৬.৫ মাইক্রোমিটার পুরু TiNiFe ফিল্ম। প্রথম ফিল্মের তৈরি যান্ত্রিক শক্তি দ্বিতীয়টিকে প্রসারিত করে। পরে চাপ ছেড়ে দিলে ধাতব স্তরটি তাপ শোষণ করে এবং শীতল হয়।

সহজভাবে বললে প্রক্রিয়াটি এমন:

তাপ → যান্ত্রিক শক্তি → ধাতব স্তরের প্রসারণ → শীতলীকরণ

এখানেই প্রচলিত কুলিং ব্যবস্থার সঙ্গে বড় পার্থক্য। সাধারণ কুলার প্রসেসরের তাপ বাইরে সরিয়ে দেয়। নতুন পদ্ধতিতে সেই বর্জ্য তাপের একটি অংশকেই শীতলীকরণ ব্যবস্থা চালানোর শক্তি হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

কম্পিউটারের প্রচলিত কুলিং ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে তার বাস্তব উদাহরণ দেখতে TechnicalBD এর Ocypus Delta A62 EX Digital CPU Cooler পর্যালোচনা পড়তে পারেন। আরও পিসি হার্ডওয়্যার বিষয়ক লেখা রয়েছে আমাদের পিসি কম্পোনেন্টস বিভাগে।

পরীক্ষায় কী ফল পাওয়া গেছে

গবেষণাগারে ৮৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় চালানোর সময় পরীক্ষামূলক যন্ত্রটি ডিভাইস পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৪.০ K তাপমাত্রার পার্থক্য তৈরি করতে পেরেছে। ধাতব ফিল্ম পর্যায়ে এই পার্থক্য ছিল সর্বোচ্চ ১২.৯ K।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গবেষকেরা বাইরে থেকে ১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তাপ উৎস ব্যবহার করেও ব্যবস্থা চালিয়েছেন। সেই পরীক্ষায় ডিভাইস পর্যায়ে ২.২ K তাপমাত্রার পার্থক্য ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।

অর্থাৎ শুধু বৈদ্যুতিকভাবে তৈরি তাপ নয়, অন্য যন্ত্র থেকে বের হওয়া বর্জ্য তাপ ব্যবহার করেও এই শীতলীকরণ পদ্ধতি চালানোর সম্ভাবনা পরীক্ষায় দেখানো হয়েছে।

প্রসেসরের নিজের তাপ কি কাজে লাগানো যাবে

এই জায়গাটিই কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয়।

KIT এর আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী ভবিষ্যতে সম্ভাব্য ব্যবহারের একটি ক্ষেত্র হতে পারে কম্পিউটার প্রসেসর। ধারণাটি হলো, প্রসেসর থেকে তৈরি বর্জ্য তাপের একটি অংশ ব্যবহার করেই শীতলীকরণ ব্যবস্থা চালানো।

তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রসেসর কোনো অতিরিক্ত ব্যবস্থা ছাড়াই নিজের তাপ দিয়ে নিজেকে পুরোপুরি ঠান্ডা করে ফেলবে। তাপকে কাজে লাগিয়ে শীতলীকরণ চক্র চালানোর শক্তি তৈরি করাই এখানে মূল বিষয়।

ডেটা সেন্টারে প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা আরও বড়

একটি ব্যক্তিগত কম্পিউটারে কয়েকটি ফ্যান চালানোর বিদ্যুৎ খরচ খুব বেশি মনে না হলেও ডেটা সেন্টারের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে হাজার হাজার প্রসেসর, জিপিইউ ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ থেকে প্রচুর তাপ তৈরি হয়।

এই তাপ সরাতে আবার বড় আকারের শীতলীকরণ ব্যবস্থা চালাতে হয়। ফলে কম্পিউটিংয়ের পাশাপাশি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও উল্লেখযোগ্য শক্তি প্রয়োজন হয়।

Nature Energy এর নতুন Research Briefing এ গবেষণাটিকে এমন একটি পথ হিসেবে দেখা হয়েছে, যেখানে সহজলভ্য নিম্নমাত্রার তাপ উৎস কাজে লাগিয়ে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমানো সলিড স্টেট কুলিং ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে।

ভবিষ্যতে প্রযুক্তিটি বড় পরিসরে কার্যকর করা গেলে ডেটা সেন্টারের কোনো অংশ থেকে বের হওয়া বর্জ্য তাপ অন্য জায়গার শীতলীকরণ ব্যবস্থার শক্তি হিসেবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এখনই কি CPU ফ্যান বাদ দেওয়া যাবে

না। প্রযুক্তিটি নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা এখানেই।

বর্তমান যন্ত্রটি মূলত একটি পরীক্ষামূলক প্রোটোটাইপ। এটি এখনো আধুনিক ডেস্কটপ প্রসেসর ঠান্ডা করার মতো বাণিজ্যিক কুলারের বিকল্প নয়।

গবেষকদের উদ্দেশ্যও এখনই বাজারের CPU কুলারকে প্রতিস্থাপন করা ছিল না। বরং তাপ ব্যবহার করে যান্ত্রিক শক্তি তৈরি এবং সেই শক্তি দিয়ে সলিড স্টেট শীতলীকরণ সম্ভব কি না, সেটিই প্রমাণ করা হয়েছে।

KIT জানিয়েছে, গবেষকেরা এখন একাধিক ফিল্ম সমান্তরালভাবে যুক্ত করে শীতলীকরণ ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

তাই বর্তমান পিসির জন্য ফ্যান, হিটসিঙ্ক এবং তরল কুলিং ব্যবস্থাই বাস্তব সমাধান। শক্তিশালী প্রচলিত কুলিং প্রযুক্তির আরেকটি উদাহরণ TechnicalBD এর Cooler Master V8 ACE 3DHP নিয়ে বিস্তারিত লেখায় দেখা যেতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের সাধারণ কম্পিউটার ব্যবহারকারীর হাতে এই প্রযুক্তি এখনই পৌঁছাচ্ছে না। তারপরও আমাদের মতো উষ্ণ আবহাওয়ার দেশে কম্পিউটার, সার্ভার কক্ষ এবং ডেটা সেন্টারের তাপ নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

দেশে ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড অবকাঠামো যত বাড়বে, যন্ত্রপাতি চালানোর পাশাপাশি সেগুলো ঠান্ডা রাখার শক্তি খরচও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বর্জ্য তাপের একটি অংশ পুনরায় কাজে লাগিয়ে যদি শীতলীকরণ ব্যবস্থার বিদ্যুৎ চাহিদা কমানো যায়, দীর্ঘমেয়াদে প্রযুক্তিটি কার্যকর হতে পারে।

তবে এটি বাণিজ্যিকভাবে কতটা সাশ্রয়ী হবে, বড় আকারে কতটা কার্যকর থাকবে এবং বাজারে পৌঁছাতে কত সময় লাগবে, সেসব প্রশ্নের উত্তর এখনো গবেষণাধীন।

ছোট প্রোটোটাইপ, কিন্তু ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ

এই গবেষণার সবচেয়ে বড় অর্জন নতুন কোনো CPU কুলার বাজারে আনা নয়। বরং গবেষকেরা দেখিয়েছেন, তাপকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তর করে সেই শক্তি দিয়েই আবার শীতলীকরণ তৈরি করা সম্ভব।

আর ৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত Nature Energy এর Research Briefing গবেষণাটির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করেছে। সেখানে দুটি Shape Memory Alloy এর ভিন্ন ভূমিকা তুলে ধরে বর্জ্য তাপের মতো সহজলভ্য তাপ উৎস ব্যবহার করে কম বিদ্যুৎ নির্ভর শীতলীকরণের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।

আজ আমরা প্রসেসরের তাপ যত দ্রুত সম্ভব বাইরে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করি। ভবিষ্যতে সেই ফেলে দেওয়া তাপের একটি অংশই যদি কুলিং ব্যবস্থা চালানোর কাজে ব্যবহার করা যায়, তাহলে প্রসেসর থেকে শুরু করে ডেটা সেন্টার পর্যন্ত তাপ নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

তবে আপাতত CPU ফ্যান খুলে রাখার সময় আসেনি। প্রযুক্তিটি এখনো গবেষণাগারেই আছে।

রাসেল আকন্দ
রাসেল আকন্দhttps://technicalbd.com
রাসেল আকন্দ TechnicalBD-এর লেখক ও সম্পাদক। তিনি স্মার্টফোন, কম্পিউটার, গ্যাজেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং দৈনন্দিন প্রযুক্তি নিয়ে সহজ ও তথ্যভিত্তিক বাংলায় লেখেন। নতুন প্রযুক্তির খবর যাচাই করে বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য ব্যবহারযোগ্যভাবে উপস্থাপন করাই তাঁর লেখার মূল লক্ষ্য।
সম্পর্কিত পোস্ট

জনপ্রিয় পোস্ট