একটি হিউম্যানয়েড রোবট ১০০ মিটার দৌড়াচ্ছে, আরেকটি খেলছে ফুটবল। কেউ ভারোত্তোলনের সময় ভারসাম্য হারাচ্ছে, আবার অন্য রোবটকে ঘরের কাজ, কারখানার কাজ কিংবা জরুরি পরিস্থিতি সামলানোর পরীক্ষায় নামানো হচ্ছে।
শুনতে কল্পবিজ্ঞানের দৃশ্য মনে হলেও ঘটনাগুলো সত্যি। চীনের বেইজিংয়ে ২২ থেকে ২৬ আগস্ট অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় World Humanoid Robot Games 2026-এ বিশ্বের ১৬টি দেশের ৬৬৬ দল এবং ২,০৫৬টি রোবট অংশ নিয়েছে।
এবার শুধু অংশগ্রহণকারী বাড়েনি, প্রতিযোগিতার পরিধিও আগের চেয়ে অনেক বড় হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৬টি ইভেন্ট থেকে সংখ্যা বেড়ে ২০২৬ সালে হয়েছে ৫১টি, যার মধ্যে ছিল প্রতিযোগিতামূলক এবং বাস্তব পরিস্থিতিভিত্তিক দুই ধরনের পরীক্ষা।
রোবটের চলাচল ও পরিবেশ বোঝার প্রযুক্তি কীভাবে এগোচ্ছে, তা বুঝতে TechnicalBD-এর NVIDIA Isaac ROS 5.0 এবং রোবটের AI সক্ষমতা সম্পর্কিত প্রতিবেদনটিও কাজে লাগবে। আধুনিক রোবটকে শুধু চললেই হয় না, চারপাশের তথ্যও দ্রুত বুঝতে হয়।
১০০ মিটারে ৮.৬৪ সেকেন্ড
এবার সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ১০০ মিটার দৌড়ের ফল। Beijing Humanoid Robot Innovation Center-এর তৈরি Tiangong Ultra বড় আকারের রোবট বিভাগে ১০০ মিটারের ফাইনাল শেষ করেছে মাত্র ৮.৬৪ সেকেন্ডে।
Reuters এর final result অনুযায়ী, এর আগে কোয়ালিফাইং পর্যায়ে রোবটটি ৯.৩৯ এবং ৮.৮৬ সেকেন্ডের সময়ও করেছিল। শেষ পর্যন্ত ৮.৬৪ সেকেন্ডই ছিল প্রতিযোগিতার সেরা ফল।
মানুষের ১০০ মিটারের বিশ্বরেকর্ড Usain Bolt-এর ৯.৫৮ সেকেন্ড। সংখ্যায় রোবটটির সময় কম হলেও “রোবট Usain Bolt-কে হারিয়েছে” বলে ধরে নেওয়া যাবে না, কারণ এটি সঠিক তুলনা নয়।
মানুষ আর রোবটের শারীরিক গঠন, দৌড় শুরুর পদ্ধতি এবং পদক্ষেপ এক নয়। এখানে বড় অর্জন হলো, দুই পায়ে দাঁড়ানো একটি যন্ত্র এত উঁচু গতিতে ছুটেও নিজের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারছে।
অগ্রগতিটা কত দ্রুত হয়েছে, সেটিও খেয়াল করার মতো। বেইজিং সরকারের ২০২৬ সালের প্রতিযোগিতার অগ্রগতির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের গেমসে বিজয়ী ১০০ মিটারের সময় ছিল ২১.৫০ সেকেন্ড।
মাত্র এক বছরে একই ধরনের প্রতিযোগিতায় সেরা সময় ২১.৫০ সেকেন্ড থেকে ৮.৬৪ সেকেন্ডে নেমে এসেছে। এটি দেখায়, হিউম্যানয়েড রোবটের মোটর, ভারসাম্য আর চলাচল নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি কত দ্রুত এগোচ্ছে।
১০০ মিটারে এবার মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছিল না
২০২৬ সালের বড় পরিবর্তনগুলোর একটি ছিল ১০০ মিটার দৌড়ের নিয়ম। বেইজিং সরকারের প্রতিযোগিতার official preview অনুযায়ী, এবার ১০০ মিটারকে fully autonomous প্রতিযোগিতা করা হয়েছিল।
অর্থাৎ দৌড়ের সময় কেউ রিমোট কন্ট্রোলার দিয়ে রোবটকে প্রতিটি পদক্ষেপে চালাতে পারেননি। রোবটকে নিজের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সেন্সর আর আগে থেকে তৈরি সফটওয়্যারের ভিত্তিতে দৌড় শেষ করতে হয়েছে।
স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার এই প্রযুক্তি এখনও নিখুঁত নয়। TechnicalBD-এর Google DeepMind এর AI Agent পরীক্ষার ফলেও দেখা গেছে, একটি বুদ্ধিমান ব্যবস্থা নির্দেশ বুঝলেও সব পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত নেবে, এমন নিশ্চয়তা এখনও নেই।
তাই ৮.৬৪ সেকেন্ডের সময়টি শুধু শক্তিশালী মোটরের গল্প নয়। দ্রুত চলার সময় ভারসাম্য রাখা, গতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং নিজের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য প্রক্রিয়া করার প্রযুক্তিও এই ফলের বড় অংশ।
রেকর্ড ভাঙছে, আবার ভুলও করছে
দৌড়ের সময়গুলো দেখে মনে হতে পারে, হিউম্যানয়েড রোবট মানুষের দৈনন্দিন কাজ নেওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বাস্তবে প্রতিযোগিতার বিভিন্ন দৃশ্য প্রযুক্তিটির বর্তমান সীমাবদ্ধতাও সমানভাবে সামনে এনেছে।
কোনো রোবট দৌড়ের সময় পড়ে গেছে, কেউ ঠিকভাবে থামতে পারেনি। কিছু প্রতিযোগিতায় ভারসাম্য আর বস্তু ধরার সমস্যাও দেখা গেছে। গবেষকদের কাছে এসব ব্যর্থতা সফল দৌড়ের মতোই কাজের তথ্য হতে পারে।
দ্রুত দৌড়াতে পারা আর বাস্তব পরিবেশে নিরাপদে কাজ করতে পারা এক জিনিস নয়। মানুষের পাশে কাজ করতে হলে রোবটকে বাধা শনাক্ত করতে হবে, সময়মতো থামতে হবে এবং ভুল হলে নিরাপদে পরিস্থিতি সামলাতে হবে।
এ কারণেই আজকের রোবট উন্নয়নে শুধু শক্তিশালী হার্ডওয়্যার যথেষ্ট নয়। তথ্য স্থানীয়ভাবে দ্রুত প্রক্রিয়া করার বিষয়টিও জরুরি। TechnicalBD-এর লোকাল AI ও AI Agent গাইডে ডিভাইসের নিজের হার্ডওয়্যার ব্যবহার করে তথ্য প্রক্রিয়ার ধারণাটি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
আসল পরীক্ষা শুধু দৌড় এবং ফুটবল ছিল না
ভাইরাল ভিডিওগুলোতে দৌড়, ফুটবল বা মার্শাল আর্ট বেশি দেখা গেলেও এবারের গেমসের অন্যতম বড় অংশ ছিল বাস্তব কাজের পরীক্ষা। আয়োজকেরা এবার মোট ২১টি scenario based event রেখেছিলেন।
বেইজিং সরকারের event বিবরণ অনুযায়ী, রোবটকে ঘরের কাজ, অগ্নিনির্বাপন, খুচরা বিক্রয়ের পরিবেশে সহায়তা এবং বিভিন্ন সূক্ষ্ম হাতের কাজের পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে ঘরের পরিবেশে কাপড় ভাঁজ করা, জরুরি পরিস্থিতিতে আগুন নেভানো এবং খুচরা বিক্রয়ের পরিবেশে খাবার তৈরির মতো কাজ রাখা হয়েছিল। দেখতে সাধারণ হলেও এসব কাজে একটি রোবটকে একসঙ্গে অনেক প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান করতে হয়।
রোবটকে প্রথমে বস্তু শনাক্ত করতে হয়, তারপর তার অবস্থান বুঝতে হয়। এরপর হাতের সঠিক অংশ দিয়ে সেটি ধরে প্রয়োজনীয় জায়গায় নিতে হয়। প্রতিটি ধাপে সামান্য ভুলেই পুরো কাজ ব্যর্থ হতে পারে।
পরীক্ষাগার থেকে বাস্তব পরিবেশে
২০২৬ সালের আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো, পরিস্থিতিভিত্তিক প্রতিযোগিতাগুলোকে শুধু বিশেষভাবে তৈরি পরীক্ষার জায়গায় আটকে রাখা হয়নি। রোবটকে এবার কারখানা, হোটেল এবং মডেল হোমের মতো বাস্তব পরিবেশে কাজ করতে হয়েছে।
SCIO-এর World Humanoid Robot Games প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২১টি পরিস্থিতিভিত্তিক প্রতিযোগিতার মধ্যে কারখানা, হোটেল, বাড়ি এবং লজিস্টিকস স্থাপনা সম্পর্কিত বাস্তব কাজ ছিল।
এর কারণ পরিষ্কার। পরীক্ষাগারে রোবটের চারপাশ আগে থেকেই সাজিয়ে রাখা যায়। কিন্তু বাস্তব কারখানা বা ঘরে বস্তু সব সময় একই জায়গায় থাকে না, আলো বদলায় এবং হঠাৎ বাধাও আসতে পারে।
তাই প্রদর্শনীতে সুন্দর কাজ করা আর বাস্তব কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত নির্ভরযোগ্যভাবে একই কাজ করা এক কথা নয়। ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক হিউম্যানয়েড রোবট তৈরির জন্য দ্বিতীয় সমস্যাটিই অনেক বেশি জরুরি।
রোবটের শরীর দ্রুত উন্নত হচ্ছে, কিন্তু মস্তিষ্কের পরীক্ষা আরও কঠিন
হিউম্যানয়েড রোবট এখন আগের চেয়ে দ্রুত হাঁটছে, দৌড়াচ্ছে এবং ভার তুলছে। কিন্তু অপরিচিত পরিস্থিতিতে নিজে পরিবেশ বুঝে পরের পদক্ষেপ ঠিক করা এখনও রোবট গবেষণার সবচেয়ে কঠিন সমস্যাগুলোর একটি।
এখানেই embodied AI-এর কথা আসে। ভাষাভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো শুধু প্রশ্নের উত্তর দিলে চলবে না। রোবটকে ক্যামেরা ও সেন্সরের তথ্য বুঝে বাস্তব জগতে শারীরিকভাবে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হবে।
TechnicalBD-এর নিজের পিসিতে কাজ করা AI Agent নিয়ে ASUS এর প্রদর্শনী দেখায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবস্থাগুলোও ধীরে ধীরে শুধু উত্তর দেওয়ার বদলে ধারাবাহিকভাবে একটি কাজ পরিকল্পনা করে শেষ করার দিকে যাচ্ছে।
রোবটের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও কঠিন, কারণ একটি ভুল সফটওয়্যার সিদ্ধান্ত শুধু পর্দার ভেতরে থাকে না। তা ভুল দিকে হাঁটা, কোনো বস্তু ফেলে দেওয়া কিংবা মানুষের নিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
চীনের এত বড় রোবট গেমস আয়োজনের কারণ কী
এই আয়োজন দর্শকদের বিনোদন দিলেও এর পেছনে বড় শিল্প ও গবেষণা লক্ষ্য রয়েছে। প্রতিযোগিতায় রোবটকে চাপের মুখে ফেললে হার্ডওয়্যার আর সফটওয়্যারের দুর্বলতা পরীক্ষাগারের চেয়ে দ্রুত ধরা পড়তে পারে।
SCIO-এর অংশগ্রহণ সংক্রান্ত official তথ্য অনুযায়ী, ৬৬৬ দলের মধ্যে ৬৪১টি দল ছিল চীনের। এসব দলে ১৫৭টি প্রতিষ্ঠান এবং ২০০টি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব ছিল।
২০২৫ সালের প্রথম World Humanoid Robot Games-এ ১৬টি দেশের ২৮০টি দল এবং পাঁচ শতাধিক রোবট অংশ নিয়েছিল। এক বছরের ব্যবধানে দল বেড়ে ৬৬৬ এবং রোবট বেড়ে ২,০৫৬ হওয়া খাতটির দ্রুত সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দেয়।
চীন রোবটকে শুধু প্রতিযোগিতার মধ্যে আটকে রাখতে চাইছে না। উৎপাদন, সেবা, বাড়ির কাজ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারযোগ্য করতে দেশটির প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা দলগুলো বড় পরিসরে কাজ করছে।
তবে এই প্রতিযোগিতার ফল দেখে বলা যায় না যে কোন দেশ পুরো রোবট শিল্পে এগিয়ে আছে। World Humanoid Robot Games একটি নির্দিষ্ট আয়োজন, পুরো বৈশ্বিক রোবোটিক্স শিল্পের সরাসরি র্যাঙ্কিং নয়।
শেষ কথা
২০২৬ সালের Robot Olympics-এর সবচেয়ে বড় খবর শুধু Tiangong Ultra-এর ৮.৬৪ সেকেন্ডের ১০০ মিটার নয়। আরও বড় কথা হলো, হিউম্যানয়েড রোবটকে এখন বাস্তব পরিবেশ আর স্বয়ংক্রিয় কাজের কঠিন পরীক্ষায় নামানো হচ্ছে।
বর্তমান রোবট দ্রুত দৌড়াতে, ফুটবল খেলতে এবং নানা শারীরিক কাজ করতে পারছে। একই সঙ্গে অপ্রত্যাশিত পরিবেশ, সূক্ষ্ম হাতের কাজ আর নিরাপদ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
২০২৫ সালে বিজয়ী রোবটের ১০০ মিটার শেষ করতে ২১.৫০ সেকেন্ড লেগেছিল, আর ২০২৬ সালে দেখা গেছে ৮.৬৪ সেকেন্ডের সময়। এক বছরের এই পরিবর্তন উপেক্ষা করার উপায় নেই।
তাই আজ পড়ে যাওয়া রোবটগুলোকে শুধু ব্যর্থতার ভিডিও হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটি ধরা পড়বে না। এগুলোর মধ্যেই ভবিষ্যতের কারখানা কর্মী, উদ্ধারকারী কিংবা ঘরের সহকারীর প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরি হচ্ছে।
রোবটগুলো এখনও নিখুঁত নয়, মানুষের সব কাজ নেওয়ার পর্যায়েও পৌঁছায়নি। কিন্তু যে গতিতে তাদের চলাচল, স্বয়ংক্রিয়তা আর বাস্তব পরিবেশে কাজ করার সক্ষমতা বাড়ছে, সেটিই ২০২৬ সালের Robot Olympics-এর সবচেয়ে বড় বার্তা।
সর্বশেষ আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০২৬

