সাইবার নিরাপত্তার জগতে ওপেন-সোয়ার্স ডাটাবেস প্রসেসিং সিস্টেম রেডিস (Redis) অত্যন্ত জনপ্রিয়। দ্রুত ডেটা ক্যাশিং, রিয়েল-টাইম মেমোরি অ্যানালিটিক্স এবং সার্ভার পারফর্ম্যান্স বাড়ানোর জন্য বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ ডেভেলপার ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান এটি ব্যবহার করে থাকেন।
তবে সাম্প্রতিক সাইবার সিকিউরিটি গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে এক আশঙ্কাজনক তথ্য! আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি নিরাপত্তা বিষয়ক পোর্টাল দ্য হ্যাকার নিউজ (The Hacker News)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুখ্যাত হ্যাকার ও থ্রেট অ্যাক্টর গ্রুপ ‘TeamPCP’ বিগত চার বছর ধরে (২০২২ সাল থেকে) উন্মুক্ত বা অসুরক্ষিত রেডিস সার্ভারগুলোতে গোপনে সাইবার হামলা চালিয়ে আসছে।
কখনও ক্রিপ্টো-মাইনিং মেলওয়্যার ইনস্টল করে, আবার কখনও সম্পূর্ণ ডাটাবেস হাইজ্যাক করে ক্রিপ্টোকারেন্সি দাবি করার মতো অপরাধে যুক্ত এই হ্যাকারদের বিস্তারিত কর্মপদ্ধতি প্রকাশ পেয়েছে সিকিউরিটি রিপোর্টে।
টেকনিক্যাল বিডি (Technical BD)-এর এই প্রতিবেদনে চলুন জেনে নেওয়া যাক TeamPCP গ্রুপের হামলা চালানোর পদ্ধতি এবং কীভাবে আপনার রেডিস ডাটাবেস সুরক্ষিত রাখবেন।
১. ‘TeamPCP’ হ্যাকার গ্রুপ কীভাবে রেডিস সার্ভারে হামলা চালায়?
সিকিউরিটি গবেষকদের মতে, TeamPCP মূলত সেইসব রেডিস ডাটাবেসকে টার্গেট করে যা ইন্টারনেটে সরাসরি উন্মুক্ত (Misconfigured or Internet-Exposed) এবং যাতে কোনো পাসওয়ার্ড এনক্রিপশন বা শক্তিশালী পাসওয়ার্ড পলিসি দেওয়া নেই:
-
অটোমেটেড আইপি স্ক্যানিং (Automated IP Scanning): হ্যাকাররা অটোমেটেড বট ব্যবহার করে পোর্ট
6379-এ চলা হাজার হাজার রেডিস সার্ভার নিয়মিত স্ক্যান করে যেসব সার্ভারে রিমোট কোড এক্সিকিউশন (RCE) চালানো সম্ভব। -
ম্যালিশাস লুয়া স্ক্রিপ্ট (Lua Scripting) ও ক্রোন জব: অনুপ্রবেশ করার পর তারা রেডিস ডিরেক্টরিতে বিশেষ লুয়া স্ক্রিপ্ট পাঠায় এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে ক্ষতিকর Cron Jobs ও সিস্টেম সার্ভিস রেজিস্টার করে ফেলে।
-
ক্রিপ্টো-মাইনার ও ব্যাকডোর মেমোরি: সার্ভারের পুরো সিপিইউ (CPU) প্রসেসিং ক্ষমতা ব্যবহার করে তারা গোপনে ক্রিপ্টোকারেন্সি (Monero) মাইনিং করে এবং ডাটাবেস সিস্টেমকে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে।
২. কেন রেডিস ডাটাবেস আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে?
-
ডিফল্ট কনফিগারেশনে অবহেলা: নতুন রেডিস ইনস্টল করার পর অনেক ডেভেলপার ডিফল্ট কনফিগারেশন পরিবর্তন করেন না।
-
বাইন্ডিং আইপি এড্রেস না বদলানো:
redis.confফাইলে সঠিক আইপি (bind 127.0.0.1) সেট না করে সরাসরি পাবলিক ওয়ার্ল্ডে ওপেন রাখা। -
স্টাফ সিকিউরিটি ইগনোরেন্স: ডেভেলপমেন্ট টেস্টিংয়ের উদ্দেশ্যে ক্লাউডে সাময়িকভাবে অসুরক্ষিত রাখা সার্ভার পরবর্তীতে অফ করতে ভুলে যাওয়া।
৩. আপনার রেডিস (Redis) ডাটাবেস সুরক্ষিত রাখার ৪টি উপায়
অসুরক্ষিত রেডিস সার্ভারকে হ্যাকারদের হাত থেকে বাঁচাতে সিকিউরিটি এক্সপার্টদের দেওয়া কয়েকটি নিয়ম তাৎক্ষণিকভাবে মেনে চলা উচিত:
-
Protected Mode অন রাখা: নিশ্চিত করুন আপনার
redis.confফাইলেprotected-mode yesকনফিগার করা রয়েছে। -
শক্তিশালী পাসওয়ার্ড এনক্রিপশন: ডাটাবেসে ঢুকতে বাধ্যতামূলক পাসওয়ার্ড প্রম্পট সেট করুন। কমান্ড ফাইলে
requirepassঅপশনে একটি দীর্ঘ ও জটিল সিক্রেট কি সেট করুন। -
বিপজ্জনক কমান্ড ডিজেবল করা: রেডিসের কিছু পাওয়ারফুল কমান্ড (যেমন-
CONFIG,FLUSHALL,EVAL) যেগুলো সরাসরি কোড এক্সিকিউট করতে পারে, সেগুলোর নাম পরিবর্তন করুন বা ডিজেবল করে দিন (rename-command CONFIG "")। -
ফায়ারওয়াল ও ভিপিএন (VPC/Firewall): রেডিস পোর্ট ৬৩৭৯-কে কখনই গ্লোবাল ইন্টারনেটের কাছে এক্সপোজ করবেন না। কেবল আপনার ব্যাকএন্ড অ্যাপ্লিকেশনের নির্দিষ্ট আইপি বা প্রাতিষ্ঠানিক ভিপিএন নেটওয়ার্ককে এই পোর্টে ঢুকতে অনুমতি (Whitelist) দিন।
সাধারণ কিছু প্রশ্ন (FAQs)
প্রশ্ন ১: কীভাবে বুঝব আমার রেডিস সার্ভার আক্রান্ত হয়েছে কি না?
উত্তর: সার্ভারের সিপিইউ ব্যবহার হঠাৎ ১০০% এ পৌঁছে গেলে, অজানা কোনো Cron Job ফাইল তৈরি হলে কিংবা অচেনা প্রসেস মেমোরিতে রান করতে দেখলে বুঝতে হবে সার্ভারে ক্ষতিকর লুপ বা মেলওয়্যার ক্রাফট করা হয়েছে।
প্রশ্ন ২: সুরক্ষিত না থাকা রেডিস কি সাইবার অ্যাটাকের জন্য পুরোপুরি দায়ী?
উত্তর: না, রেডিস নিজেই একটি ফাস্ট ডাটাবেস ইঞ্জিন। সমস্যা তৈরি হয় যখন সঠিক সিকিউরিটি কনফিগারেশন না করে একে ইন্টারনেটে উন্মুক্ত রাখা হয়।
শেষ কথা
TeamPCP-এর মতো সাইবার ক্রাইম গ্রুপগুলোর দীর্ঘমেয়াদী হামলা প্রমাণ করে যে ডেভেলপমেন্ট এবং সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে সিকিউরিটি কনফিগারেশনকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ডাটাবেস সুরক্ষায় ‘Zero Trust’ নীতি অনুসরণ করাই হতে পারে সাইবার অ্যাটাক থেকে বাঁচার সেরা পথ।
আপনার সার্ভার ও ডাটাবেস কি সুরক্ষিত আছে? কমেন্ট করে জানান আপনার মতামত এবং প্রযুক্তি ও সাইবার সিকিউরিটি সচেতন বন্ধুদের সাথে পোস্টটি শেয়ার করুন!
