২০২৭ সালে আইফোনের ২০ বছর পূর্ণ হবে। এই বিশেষ উপলক্ষে অ্যাপল প্রিমিয়াম আইফোনের নকশায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে একাধিক প্রযুক্তি সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। চারদিকে বাঁকানো কাচ, সরু বেজেল আর আরও বড় পর্দা হতে পারে এই পরিবর্তনের প্রধান আকর্ষণ।
তবে শুরুতেই একটি কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার। অ্যাপল এখনো iPhone 20 Pro নাম বা এর চূড়ান্ত নকশা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি। এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে, তা এসেছে সরবরাহব্যবস্থা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন, বিশ্লেষকদের ধারণা এবং বিভিন্ন সূত্রের ফাঁস হওয়া খবর থেকে।
২০২৭ সালের আইফোনের নকশায় কী পরিবর্তন আসতে পারে
২০১৭ সালে আইফোনের দশম বার্ষিকীতে অ্যাপল iPhone X উন্মোচন করেছিল। হোম বাটন বাদ দিয়ে, বড় OLED পর্দা আর Face ID যোগ করে সেই ফোন আইফোনের পরিচিত নকশায় বড় পরিবর্তন এনেছিল। ২০২৭ সালেও এমন পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
অ্যাপলের প্রথম আইফোনের ঘোষণা থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানটির নকশাগত পরিবর্তনের ইতিহাস জানতে অ্যাপলের ২০০৭ সালের মূল ঘোষণা দেখে নিতে পারেন। তবে অতীতে বড় পরিবর্তন সফল হয়েছিল বলেই ২০২৭ সালেও একই সাফল্য আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
MacRumors এর ২১ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বার্ষিকী আইফোনে চারদিকে বাঁকানো পর্দা, উন্নত OLED প্রযুক্তি এবং সামনের ক্যামেরা ও Face ID ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা নিয়ে গুঞ্জন রয়েছে।
চারদিকে বাঁকানো OLED পর্দা হতে পারে প্রধান আকর্ষণ
এখন পর্যন্ত আলোচিত পরিবর্তনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো পর্দার চার পাশ বাঁকানো। এই নকশায় সামনের কাচ ফোনের প্রান্তের দিকে নেমে আসতে পারে, ফলে পাশের বেজেল অনেক কম চোখে পড়বে। সামনে থেকে তাকালে প্রায় পুরো অংশটাই পর্দা মনে হতে পারে।
তবে এর মানে এই নয় যে পুরো ফোনের কাঠামো কাচের হবে। MacRumors এর ৫ অক্টোবরের বিস্তারিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সামনে ও পেছনে বাঁকানো কাচের সঙ্গে মাঝখানে ধাতব কাঠামো রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। এমন নির্মাণ নকশাকে আকর্ষণীয় রাখার পাশাপাশি ফোনের দৃঢ়তাও ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
পর্দায় মাইক্রো কার্ভ বা অল্প বাঁক ব্যবহার করা হলে অতিরিক্ত বাঁকানো পর্দার কিছু পরিচিত সমস্যা কমতে পারে। যেমন প্রান্তে লেখা বা ছবির বিকৃতি এবং স্পর্শ নিয়ন্ত্রণের অসুবিধা। তবে নতুন নকশা বাস্তবে কতটা আরামদায়ক হবে, তা হাতে নিয়ে পরীক্ষা না করা পর্যন্ত নিশ্চিত করে বলা যাবে না।
Face ID কি পর্দার নিচে চলে যাবে?
নতুন আইফোন নিয়ে আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো সামনের ক্যামেরা ও Face ID সেন্সরের অবস্থান। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যাপল Face ID-এর প্রয়োজনীয় অংশগুলো পর্দার নিচে বসানোর প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। এটি সফল হলে সামনের পর্দার দৃশ্যমান কাটআউট আরও ছোট হতে পারে।
কিন্তু এই প্রযুক্তি ২০২৭ সালের মডেলেই পুরোপুরি প্রস্তুত হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। Macworld এর ১৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, Face ID পর্দার নিচে নেওয়া নিয়ে বিভিন্ন সূত্রের তথ্য এক নয়। তাই ছোট Dynamic Island বা ক্যামেরার ছিদ্র থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পূর্ণ কাটআউটহীন আইফোনের যে ছবি দেখা যায়, সেগুলোকে চূড়ান্ত নকশা ভেবে নেবেন না। ধারণাভিত্তিক ছবিতে প্রযুক্তিটি বাস্তবের চেয়ে অনেক সহজ মনে হয়। অথচ সেন্সরের কার্যকারিতা, পর্দার স্বচ্ছতা এবং উৎপাদন খরচের মতো বিষয়ও এখানে বড় ভূমিকা রাখে।
পর্দার আকার কি আরও বড় হবে?
ফাঁস হওয়া তথ্য অনুযায়ী, বার্ষিকী আইফোনের প্রো মডেলে প্রায় ৬.৪১ ইঞ্চি এবং প্রো ম্যাক্স মডেলে প্রায় ৬.৯৬ ইঞ্চি পর্দা পরীক্ষা করা হচ্ছে। বর্তমান মডেলগুলোর তুলনায় এই পরিবর্তন খুব বড় না হলেও সরু বেজেলের কারণে ফোনের সামনের অংশ আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে।
9to5Mac এর ২১ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে এই সম্ভাব্য পর্দার মাপের কথা বলা হয়েছে। তবে এগুলো ফাঁস হওয়া তথ্য, অ্যাপলের নিশ্চিত করা স্পেসিফিকেশন নয়। চূড়ান্ত পণ্যে পর্দার মাপ কিংবা মডেলের সংখ্যা বদলে যেতে পারে।
বড় পর্দা ভিডিও দেখা, ছবি সম্পাদনা এবং একাধিক অ্যাপ ব্যবহারে সুবিধা দিতে পারে। অন্যদিকে ফোনের মোট আকার, ওজন আর এক হাতে ব্যবহারের আরামও ভেবে দেখতে হবে। শুধু পর্দা বড় হলেই ব্যবহারের অভিজ্ঞতা ভালো হয়ে যায় না।
নতুন A21 Pro প্রসেসর আসতে পারে
২০২৭ সালের প্রিমিয়াম আইফোনে পরবর্তী প্রজন্মের A সিরিজ প্রসেসর ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে A21 বা A21 Pro নাম নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে চিপের নাম, কোর সংখ্যা, গতি কিংবা শক্তি ব্যবহারের পরিমাণ এখনো নিশ্চিত নয়।
নতুন প্রসেসর এলে কর্মক্ষমতা ও গ্রাফিক্স উন্নত হতে পারে, আর ফোনের ভেতরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাজও দ্রুত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু উৎপাদন প্রযুক্তি ছোট হলেই ফোন দ্রুত হয়ে যায় না। চিপের নকশা, তাপ নিয়ন্ত্রণ, মেমোরি এবং সফটওয়্যারের সমন্বয়ও সমান জরুরি।
অ্যাপলের সাম্প্রতিক প্রসেসর প্রযুক্তির অগ্রগতি বুঝতে আমাদের A20 Pro প্রসেসর নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ পড়তে পারেন। বর্তমান প্রজন্মের প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা থাকলে পরের চিপে কী ধরনের উন্নতি আশা করা যুক্তিসংগত, তা বোঝা সহজ হবে।
ব্যাটারি ও ক্যামেরাতেও কি উন্নতি হবে?
আরেকটি সম্ভাব্য পরিবর্তন হলো উন্নত ব্যাটারি প্রযুক্তি। কিছু প্রতিবেদনে সিলিকন অ্যানোডভিত্তিক ব্যাটারি নিয়ে অ্যাপলের গবেষণার কথা বলা হয়েছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে একই আকারের ব্যাটারিতে বেশি শক্তি ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে। তবে ২০২৭ সালের আইফোনে এটি নিশ্চিতভাবে থাকবে, এমন কোনো তথ্য নেই।
ক্যামেরার ক্ষেত্রেও নতুন সেন্সর প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা রয়েছে। আলো ধরার ক্ষমতা আর ডায়নামিক রেঞ্জ উন্নত হলে রাতের ছবি ও উজ্জ্বল আলোয় তোলা ছবির মান ভালো হতে পারে। কিন্তু সেন্সরের নির্দিষ্ট মাপ, মেগাপিক্সেল কিংবা বাস্তব ছবির মান নিয়ে এখনো নির্ভরযোগ্য চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
তাই ব্যাটারি ও ক্যামেরাকে নিশ্চিত আপগ্রেড ধরে নেবেন না। অ্যাপলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং স্বাধীন পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলে এসব পরিবর্তনের বাস্তব সুবিধা আরও পরিষ্কার হবে।
বাংলাদেশের ব্যবহারকারীদের জন্য কী গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের বাজারে নতুন মডেল এলে দাম, ওয়ারেন্টি, মেরামত খরচ এবং যন্ত্রাংশের প্রাপ্যতা বড় বিষয় হয়ে উঠবে। বাঁকানো পর্দা দেখতে আকর্ষণীয় হলেও সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে মেরামত কতটা ব্যয়বহুল হবে, তা কেনার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
আপনি যদি এখন আইফোন ব্যবহার করেন, শুধু নতুন নকশার গুঞ্জন শুনে আপগ্রেডের পরিকল্পনা করবেন না। চূড়ান্ত ক্যামেরা পরীক্ষা, ব্যাটারির কার্যক্ষমতা, দৈনন্দিন ব্যবহারের আরাম এবং দাম যাচাই করার পর সিদ্ধান্ত নেওয়াই ভালো। বর্তমান বড় পর্দার আইফোনের সঙ্গে তুলনার জন্য iPhone Duo ও iPhone 18 Pro Max এর তুলনামূলক আলোচনা পড়ে দেখতে পারেন।
বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক দাম, বিক্রির তারিখ কিংবা ওয়ারেন্টি নিয়ে এখনই নিশ্চিত কিছু বলা সম্ভব নয়। ফোনটি উন্মোচনের পর স্থানীয় বাজারে কোন সংস্করণ পাওয়া যাবে এবং তার দাম কত হবে, সেটিও আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।
শেষ কথা
২০২৭ সালের বার্ষিকী আইফোনে চারদিকে বাঁকানো OLED পর্দা, সরু বেজেল এবং নতুন ধরনের সামনের নকশা আসতে পারে বলে একাধিক প্রতিবেদন ইঙ্গিত দিচ্ছে। নতুন প্রসেসর, ব্যাটারি ও ক্যামেরা প্রযুক্তি নিয়েও আলোচনা আছে। তবে এসব বৈশিষ্ট্যের সবগুলো একই মডেলে আসবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
সবচেয়ে জরুরি কথা হলো, iPhone 20 Pro নামটিও এখনো অ্যাপলের আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা নাম নয়। তাই এখনকার তথ্যকে সম্ভাব্য নকশা ও প্রযুক্তির গুঞ্জন হিসেবেই দেখুন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অ্যাপলের ঘোষণা এবং নির্ভরযোগ্য পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা করাই ভালো।

